Saturday, 16 April 2016

মুক্তো-খাসা


মুক্তো-খাসা

এক
মৌজা নিয়ামতগঞ্জ, থানা বিশালাক্ষিতলা, জেলা আক্রমগড়। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে তার অন্তঃপাতি দুই পাড়া ছিল --- মোক্তারপুর, খাঁসায়র। যেন ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান টিমের আত্মা পাশাপাশি দুটো গ্রামের পেটের মধ্যে ঢুকে বসে আছে। এদের গলায় গলায় ঝগড়ার ইতিহাস এমন টেঁকসই, মানুষজন কোথাও দুই দলে লড়াই লেগেছে দেখলে বলে ওঠে, বাব্বা, এ-যে মুক্তো-খাসা কেস!
তো, মুক্তো-খাসা বেধে যাওয়ার ছুতোর কোনওদিন অভাব হয়েছে, এমন শোনা যায় না। বর্ষায় মাঠ ভেসে যে-সব শরণার্থী মাছ দূরের বিলে গিয়ে পড়ল, তাদের মালিকানা নিয়ে হতে পারে, সীমানার বাঁশঝাড়ের কঞ্চি কাটা নিয়ে হতে পারে, কোরান-হাদিসের ব্যাখ্যা নিয়ে মনমানি তো খুবই সম্ভব, এমনকি এ-পাড়ার লোক ও-পাড়ার ভিডিও হলে গিয়ে হাউজফুল বোর্ড দেখলে সেই চক্রান্তের উপযুক্ত জবাব না দিয়ে কি ফিরে আসতে পারে?
তবে কোনও নিরপেক্ষ বিচারক এই আকচা-আকচির রেকর্ড ঘাঁটলে দেখবে,, টাইব্রেকারে ৫-৪-এ হলেও এগিয়ে আছে মোক্তারপুর। কেন? কারণ শহীদ গাজি, তাদের গ্রামের মৌলবী মশাই। সরল, পড়াশুনোর ধার না ধারা চাষিবাসি এলাকায় খুব অন্যরকম এই মানুষটা --- শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, আবার সজ্জনও। তার পরামর্শে বিবেচনাশক্তি বেড়েছে মোক্তারপুরের। বাচ্চাদের নিয়ম করে স্কুলে পাঠানো থেকে মহকুমা শহরে ছুটোছুটি করে সরকারি অনুদান আনা, গ্রামের সব মানুষকে, বিশেষ করে মহিলাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে শেখানো --- এসবই মৌলবী মশাইয়ের উৎসাহে। খাঁসায়রেও যে মৌলবী নেই, তা নয়। কিন্তু তিনি একটু সেকেলে, বয়েস হয়েছে, নিজের ফ্যামিলির গন্ডগোলের সালিশিতেই বেশি সময় চলে যায়, গ্রামের পাঁচটা ব্যাপারে নজর দেওয়ার এনার্জি পান না। ধর্মাদি বিষয়ে কমজোরি হওয়ার জন্যে মোক্তারপুরের সঙ্গে অন্য ঝুট-ঝামেলায় তাই দরকারের চেয়ে বেশি চিৎকার করে খাঁসায়রকে অবস্থা ম্যানেজ দিতে হচ্ছে।
দুই
তারপর মারা গেলেন সেই অসুস্থ ধর্মশিক্ষক। শোকের আবহ সরলে খানসায়রের জনতা একজন মৌলবী খুঁজতে বেরল। এবার তারা দাঁতে ঠোঁট কামড়ে নেমেছে, এমন লোককে বাছাই করে আনতে হবে, যে মোক্তারপুরের ওই পায়াভারি মক্কেলের গুমোর ভাঙতে সময় নেবে স্রেফ দুদিন। আর কী আশ্চর্য, তেমন একখানা দাওয়াই জুটেও গেল তক্ষুনি তক্ষুনি, প্রায় বিনা কষ্টে। মোল্লা একরামুল হক, কোহিতুরবাগ জেলার বাঙালিপত্তন থেকে পাশের মৌজার খায়েশপুরে আত্মীয়ের বাড়ি দাওয়াত খেতে এসেছে। বয়েসে মোক্তারপুরের শহীদ গাজির চেয়ে কিছু কমই হবে, চোখ বুঁজে কোরান সুর করে আউড়ে যায়, তারপর চোখ খুলে গড়গড় করে শুরু করে ব্যাখ্যাবিচার। সেই বিশ্লেষণ আগে কেউ কখনও শোনে নি। পাড়ার বুড়োরা এ-ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলে কী হবে, অল্প বয়েসিদের খুব মনে ধরেছে কথাবার্তা। একটা তোড়ফোড় বাধানো শিক্ষকই তো তারা চাইছিল। কামাল গাজির নাম করামাত্র একরামুল হক ঠিক যেন মোক্তা-খাসা ঐতিহ্য মেনেই বলে বসল, আরে মোক্তারপুরের মৌলবী টিঁকে থাকলে তবে তো তার উচিত শিক্ষা? খানসায়রে পা দেওয়ার ঠিক তিনদিনের মাথায় ওকে তর্কযুদ্ধে আহবান করব। দেখবে ডাক পাওয়ামাত্র কামালব্যাটা বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে পগার পার।
তিন
দুই গ্রামের সীমানা সেই বাঁশতলায় মঞ্চ বাঁধা হয়েছে। সামনের জমি বাঁকারি খাটিয়ে দুভাগ করা, বাঁদিকের মাটিতে মোক্তারপুর আর ডানদিকে খানসায়রের অধিবাসীবৃন্দ আসন গ্রহণ করবে। দুপুর দুটোয় বিতর্কসভা শুরু, কারণ এই মরণপণ লড়াই এক পক্ষ হার স্বীকার না করে নেওয়া পর্যন্ত তো থামার সুযোগ নেই! আজকের বিতর্কের বিচারক হিসেবে মঞ্চের মাঝখানে নিউ আলি ডেকরেটর্সের হাতলওলা গামার কাঠের চেয়ার অলংকৃত করার জন্যে অনেককে ধরা হয়েছিল। নসিবগঞ্জের পীরবাড়ি থেকে দরিয়াহাটের একবালপুর --- কোথায় না ইসলামী বিচারসভা উদযাপন কমিটিদৌড়েছে! কিন্তু তাদের প্রস্তাবে সবিনয়ে নাবলতে কেউ এক সেকেন্ডও টাইম নেয়নি। ওই অজ-পাড়াগাঁয় পাবলিকের ঠ্যাঙানি খেতে যাবে কে? যার পক্ষে রায় দেবে, তার উলটো দল ভালো মতো হাতের সুখ না করে তোমায় ছেড়ে দেবে ভেবেছ!
যেমন, এই গান বাজানো নিয়েই একটু আগে ধুন্দুমার বেধে গেছিল। সভামঞ্চের মাইকে সকাল থেকেই ভক্তিমূলক গান বাজছে, সেই ধর্মীয় বাতাবরণের মধ্যে হঠাৎ দেখা গেল কে একটা গণসংগীত চালিয়ে দিয়েছে, ‘শহীদের খুনে রাঙা পথে দ্যাখো হায়নার আনাগোনা...। ইচ্ছে করে না মনের ভুল, কে জানে। ব্যাস, মোক্তারপুরের ছেলেরা ডেকরেটার্সের মেশিনপত্র তুলে খাঁসায়রের জলে ফেলে দেয় আর কি! আমাদের শহীদ সায়েবের খুন দিয়ে পথ রাঙা করবে, এতবড় আস্পদ্দা...!
গাজি প্রথমে বলে দিয়েছিলেন, এইসব তর্কাতর্কির মধ্যে তিনি নেই। শাস্ত্রজ্ঞান জাহির করে আরেকজনকে হারানোয় কিছুই প্রমাণ হয় না, শুধু নিজের অহংকার ফুলে-ফেঁপে ওঠে। তার চেয়ে গ্রামের সার্বিক উন্নতিবা মুসলিম সমাজ কোন পথেজাতীয় আলোচনাসভা বসুক। কিন্তু এতে মোক্তারপুর গাঁয়ের লোকজন রাস্তাঘাটে, স্কুলে-কলেজে, মাঠে-ময়দানে, হাসপাতাল-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে খানসায়রের লোকলস্কর দ্বারা প্যাঁক খেতে লাগল, ‘তোদের শহীদ মৌলবী হেরো। একের নম্বরের ভিতু। ধর্ম আলোচনার মুরোদ নেই তো মৌলবীগিরি করতে এয়েচে কেন?’
তখন পাড়ার বয়স্কেরা এসে ধরেছে, আপনি একবার তর্কে অংশ তো নিন। ও কালকের ছেলে, আপনার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা ধরে নাকি? তাছাড়া, হার-জিত যাই হোক, আপনি আমাদের মাথায়ই থাকবেন।
চমকে উঠে মুখ তুললেন কামাল গাজি। বুকের মধ্যে বিদ্যুত ছুটে যাওয়ার মতো একটা ঝিলিক-ব্যথা খেলে গেল। তাহলে কি তার গাঁয়ের মানুষও ঘুণাক্ষরে ভেবে নিয়েছে, মৌলবী সাহেব পেরে উঠবেন না ভয়ে তর্ক এড়াতে চাইছেন! আরও একবার প্রবাদের মতো দামি সেই পুরনো কথাটা মনে আসে, ‘সাধারণ মানুষ বুদ্ধি নয়, বিশ্বাস দ্বারা চালিত
বিশ্বাস ভেঙে গেলে এদের সঙ্গে তার সম্পর্কও কি সুরক্ষিত থাকবে!
আকাশের একফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে লম্বা শ্বাস নিলেন, গাজিসাহেবঃ-
ব্যবস্থা করুন, আমি তৈরি।

চার
দেখা গেল, প্রতিপক্ষ বেশ চটকদার! স্কুলের অঙ্কস্যারের হাতে থাকা ছপ্‌টি বেতের মতো চেহারা আর হাঁটাচলার ধরণ ঠিক একটি লেজ-নাচানো ফিঙে। মেহেন্দি-করা বাহারি দাড়ি বুক পর্যন্ত নেমে এসেছে, কিন্তু দাড়ির মালিক এক জায়গায় তিষ্ঠোতে পারে না। মঞ্চে উঠেই পার্টির নেতার কায়দায় হাত নাড়তে লাগল আর ওমনি চটাপট হাততালি বাঁদিকের অডিয়েন্স থেকে। কামালের মনে হল, একরামুলের বয়েস নিশ্চিন্তে বছর ষাটেক, কিন্তু হাত-পা ছুঁড়ে-টুঁড়ে বেশ একটা তরুণ তুর্কী ভাব ধরে রেখেছে। এমন স্যাম্পেলের সঙ্গে ধর্মআলোচনা কেমন জমবে কে জানে!
যা হোক, কামাল গাজি মাথা ঝুঁকিয়ে সম্ভাষণ করলেন, ‘সেলাম ওয়ালেকুম
ওমা, ওদিক থেকে ফটাস করে জবাব এল, ‘ওয়ালেকুম গুড্ডুম’!
তার মানে? আক্কেল গুড়ুম গাজি মৌলবীর! তাকিয়ে দেখেন, একরামুল ফিরে রয়েছে মঞ্চের নিচে তার গ্রামের জনতার দিকে, আর চোখের কোন দিয়ে দেখছে কামালের প্রতিক্রিয়া। ঠোঁটে একফালি ফিচেল হাসি।
গ্রামের মানুষ এমন প্রতি-সম্ভাষণ তো বাপের জন্মেও শোনেনি। মোক্তারপুরের জনতা থতমত খেয়ে গেছে আর খাঁসায়র চেঁচাচ্ছে মহাউৎসাহে, ওহ বডিয়া দিয়েছে আমাদের মৌলবী সায়েব। খেলা শুরু হওয়ার আগেই এক গোল।
এবার লড়াই শুরু হবে, প্রশ্ন-উত্তর। কে আগে সওয়াল করে? কামালের মনে পড়ল ক্রিকেটের শিক্ষা --- যদি পিচের চরিত্র নিয়ে সন্দেহ থাকে, তবে কিছুক্ষণ ভেবে-টেবে তারপর ব্যাট করার সিদ্ধান্তই নেবে। কাজেই, একরামুল আবার তার গ্রামের দর্শকদের দিকে ঘুরে গেল। স্নেহের ভাইসকল, আমি শুধু একটা প্রশ্নই করব। তাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে, কে প্রকৃত মুসলমান আর কার একফোঁটাও ধর্মজ্ঞান নেই। কে শুধু আল্লাহের সন্তানের উন্নতি চায় আর কে এখানে ইসলামের নামে তামাশা করতে এসেছে। বলেই যাত্রার নায়কের মতো হঠাৎ এক পাক ঘুরে গিয়ে কামালের নাকের সামনে আঙুল তুলল একরামুল। বাঁশবাগানের হালকা বাতাসে তার দাড়ি ফুরফুর করছে।
বলুন জনাব, আমাকে জানান দেখি, পবিত্র কোরানের পঞ্চদশাধিকশততম সূরায় পরম করুণাময় আল্লাহ কী বাণী দিয়েছেন’?
মানে, একশো পনেরো নম্বর সূরা! কিন্তু কোরানে ত মোট একশো চোদ্দোটার বেশি সূরা নেই? আর সেই একশো চোদ্দোতম সূরা নাস্‌-এ আছে একটা রূকূর মধ্যে ছটা আয়াত, যেখানে...
নেই, নাকি আপনি জানেন না? কামালকে থামিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল একরামুল হক। কী করে ভাবলেন, খোদাতালার নির্দেশ এতই সীমাবদ্ধ যে তা একটা সামান্য সংখ্যায় আটকে থাকবে? আমার কাছে থেকে জেনে নিন পরম দয়ালু আল্লাহ্‌ কী হুকুম করেছেন সেখানে
শুনতে শুনতে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন কামাল গাজি। প্রথমে লোকটাকে জোকার শ্রেণীর বলে মনে হয়েছিল, এখন বোঝা যাচ্ছে এর নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। কোরানের নাম ব্যবহার করে নিজের মনগড়া কথায় ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোই লক্ষ একরামুলের। কামালের মনে পড়ল ওই পবিত্র গ্রন্থেরই দ্বিতীয় সূরা পঞ্চম রূকূর একটা আয়াত --- তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করো না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না। কিন্তু খাঁসায়রের মৌলবী জেনেবুঝেই গ্রামের সরল মানুষকে ভড়কাতে এসেছে। আর এটাও সে ভেবে রেখেছে যে, নিজের উদ্দেশ্য সফল করতে হলে সবার আগে কামালের মতো শিক্ষককে এলাকাছাড়া করতে হবে।
পাঁচ
মোক্তারপুরের বাসিন্দাদের আজ দুপুরটা মোটেও সুবিধের যাচ্ছে না। বিচারের আসরে প্রথম থেকেই একহাত এগিয়ে থাকছে নতুন মৌলবী। সবচেয়ে গায়ে জ্বালা ধরে, কথায় কথায় খাঁসায়রের পাবলিকের হাততালি আর হো-হো করা দেখে। আরে বাবা, বিচারসভা তো সবে আরম্ভ হল, না কি!
ভাবতে ভাবতেই মোক্তারপুরের জনগনের গালে হাত ---এই সেরেছে! তাদের কামাল সায়েব মঞ্চের ওপর খাঁসায়রের মৌলবীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল যে!
আমাকে মাফ করবেন হুজুর। আপনার জ্ঞান, বিবেচনা, ইশ্বর-অনুভূতির ধারে কাছে আমি আসতে পারি না। তবু গ্রামের লোকের অনুরোধে আর নিজের মানইজ্জত বাঁচাতে তর্কে নামতে হয়েছিল। আজ নিঃসন্দেহে আপনারই জিত হয়েছে
সমগ্র মোক্তারপুর মাথা নিচু করে বসে, আর খাঁসায়রের শপাঁচেক লোক চিৎকার দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইছে, তখন দেখা গেল, ওই নিল ডাউন অবস্থাতেই একরামুলের পায়ের কাছে ঝাঁপিয়ে পড়ে কী একটা কুড়িয়ে নিচ্ছেন কামাল গাজি। কী সেই বস্তু? দুই গ্রামের মানুষই উৎসুক, এখুনি লড়াই-জেতা নতুন মৌলবীও।
অদৃশ্য সেই উপহার হাতে নিয়ে তিনবার করে দুচোখের পাতায় ছুঁইয়ে শার্টের পকেটে যত্ন করে ঢুকিয়ে রাখলেন কামাল। তারপর উঠে ডায়াসের সামনে এসে দুহাত ছড়িয়ে দিলেন দুপাশেঃ
ভাইসব, আমি এখানে উপস্থিত অধিবাসীবৃন্দকে বলছি, মাননীয় জনাব এলরামুল হক কিন্তু যে সে লোক নন। ধর্মশিক্ষকের ছদ্মবেশে উনি আসলে একজন পীরসায়েব। এর নানা চমৎকারের খবর আমি লোকমুখে শুনেছি। 
যদি আমার কথায় ভরসা না জাগে, তবে আল্লাহ্‌র একবড় খিদমতগারকে সামনে পেয়ে আপনারাই জিগেস করে নিন না কেন
একরামুল হক মাথা ঝুঁকিয়ে হাসিমুখে হাত নাড়ান। 
হে আমার প্রিয় বন্ধুরা, নিজের গুণাবলীর কথা নিজমুখে বলতে চাই না। কিন্তু ফুল ফুটলে সুবাস তো ছড়াবেই। কামালভাই যা বলেছে, তার প্রতিটা অক্ষরই সত্যি
সেই গামার কাঠের চেয়ারে একরামুলকে সসম্মানে বসিয়ে দিয়ে কামাল গাজি আবার মঞ্চের সামনে এগিয়ে আসেনঃ
দর্শকেরা নিশ্চয়ই ভাবছেন, আমি কোন জিনিসটা এত ভক্তিভরে সংগ্রহ করলাম। আপনারা কেউ জানেন না, একরামুল সাহেবের সুমহান দাড়ির পবিত্র একটি কেশ যদি কেউ তাবিজ করে শুক্রবার দিন হাতে বা গলায় পরতে পারে, আহা আজই কিনা সেই শুক্কুরবার, তবে ইহজীবনে তাকে বাতের ব্যথা আর অম্বলে কষ্ট পেতে হবে না
দর্শকদের মধ্যে একটা আলোড়ন পড়ে গেল। কয়েকজন উঠে দাঁড়িয়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাত বাড়াল নতুন মৌলবীর দিকে। একরামুল বুঝতে পেরেছে কালামের দেওয়া গ্যাসটা খাওয়া উচিত হয়নি, সে চেয়ার থেকে উঠে ছুটল তার দিকে,
ওদের থামান, আমাকে মারার প্ল্যান করছেন নাকি’?
ঘাবড়াবেন না, পুরো ডিফেন্সিভ খেলছি। একটাই লক্ষ --- আপনি যেন এই দুই গ্রামের মানুষের সর্বনাশ করতে না পারেন’!
আবেদনে সাড়া না পেয়ে ততক্ষণে খাঁসায়রের বাসিন্দারা লাফিয়ে স্টেজের ওপর উঠে আসতে লেগেছে। বুড়ো বাপ-মায়ের জন্যে তাদের সন্তানের এই সামান্য প্রয়াস, যারা কিনা কদিন আগে খুব যত্ন করে একরামুলকে পাড়ায় এনে তুলেছিল। বাত আর পেটের রোগে কষ্ট পায় না এমন কেউ আছে নাকি পৃথিবীতে! কাজেই পবিত্র দাড়ি কিছু বেশি পরিমাণ ছিঁড়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
একরামুলের থুতনি থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। কামাল গাজির নির্দেশে তাকে প্রাণপণে বাঁচানোর চেষ্টা করছে মোক্তারপুরের যুবকেরা। এও এক পরিহাসই বটে। অবশ্য একটু পরেই তর্কযুদ্ধ গৌণ হয়ে গিয়ে দুই পাড়ার পুরনো ঝগড়া মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। এবারের ইস্যু --- আমাদের মৌলবীকে বাঁচানোর তোরা কে?
সেই সুযোগে একরামুলকে নিয়ে বাঁশবাগানের পেছনের পটলক্ষেত পার করে ছুটলেন কামাল। 
পালাও একরামুলভাই, সোজা বাঙালিপত্তনে ফেরো এখান থেকে
দেশে চলে যাব? শুনেছি পাশের গ্রামের নাম দত্তহাটি, সেখানে গা-ঢাকা দিয়ে থাকি নয়, তারপর পরিস্থিতি শান্ত হলে...
লাভ নেই গো! ফকির-পীরে ভক্তির ব্যাপারে ওরা খাঁসায়রের চেয়ে আরও এক মাইল এগিয়ে আছে
ছয়
গল্প শেষ, তবে দুটো পয়েন্ট বাকি থাকল। এক নম্বরটা গুজব হওয়ার খুব চান্স। সেই রাতেই বাঙালিপত্তনে ফিরে যাওয়ার পরে হারিকেনের আলোয় স্বামীর মুখ দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠেন মীরাতুন বিবি। হায় হায়, কোন হতচ্ছাড়া ইবলিশের পো তোমার এই দশা করল গো’!
দুকখু করিস না। আসলে আমি যে পীর-পয়গম্বর মানুষ, আমার একটা দাড়িতে তাবিজ বানালে একশো বছরের পুরনো বাত সেরে যায়, এসব গোপন খবর দেখি ওই অতদূরেও কীভাবে চারিয়ে গেছে’!
এক মুহূর্তে হামিদার চোখের জল শুকিয়ে সেখানে তোলা উনুনের আঁচ ফুটে উঠেছে।
অহ্‌, আমি এদিকে বাতের ব্যথায় মাজা তুলতে পারি না, আর উনি এখানে-ওখানে ফিরি-তে দাড়ি ফিরি করে বেড়াচ্চেন’?
তারপর নাকি যে-তিনগাছি পশম তখনও হকসায়েবের মুখের তিন জায়গায় শোভা পাচ্ছিল, বিবির হ্যাঁচকা টানে তার বিলিব্যবস্থা পাকা হয়ে যায়!
তবে, দ্বিতীয় ঘটনাটা আনন্দজনক। শুরুতে বলেছিলাম না, আগে দুই দলের ঝগড়া-মারামারি হলে তাকে মুক্তো-খাসা অবস্থাডাকা হতো? এই ঘটনার পর ধারাটা পালটে গেল। এবার থেকে সরল বিশ্বাসী জনতা যখনই তাকে ঠকানোর কোনও চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে, গ্রামের লোকেরা বলেছে --- আহা, একদম মুক্তো-খাসাব্যাপার!





No comments:

Post a Comment