Monday, 18 April 2016

সা রে গা মা পাক --- কখন ‘জাগে’, কখন ‘জাগে’ না

সা রে গা মা পা --- কখন ‘জাগে’, কখন ‘জাগে’ না
ভালো গাওয়া হ’লে ভালো গান, আগে যতবারই শোনা থাকুক না, আপনাকে মাতিয়ে দেবেই। “আকাশভরা সূর্যতারা”র ব্যাপারেও সেই এক কথা। দুর্নিবারকে আমরা কি এমনি এমনি ভালোবাসি? অন্তরা-য় (কৌশিকী বললেন, ‘প্রথম অন্তরা’, যদিও রবীন্দ্রসংগীতে অন্তরা একটাই হয় --- গানের দ্বিতীয় স্তবক) ‘জোয়ার-ভাঁটায় ভুবন দোলে’তে “ধনি -র্সনি –ধনি ধপা(‘ধা’ স্পর্শ স্বর)” --- এই স্বরগুচ্ছ ছেলেটা যে অলস খুশিতে গলায় তুলে আনল সেটা শীতের রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে দোতলার ছাদে বসা বনেদি বাড়ির মেয়ের সৌন্দর্য।
কিন্তু তুমি ওখানটায় কী করলে দুর্নিবার? সঞ্চারী থেকে আভোগে সঞ্চারিত হওয়ার মুখে ‘বিস্ময়ে তাই জাগে’-র ‘জাগে’-তে?
এই গানের কথায় ‘জাগে’ রয়েছে মোট চারবার, স্তবকের শেষে ধুয়োর মতো। আর, সুরে প্রত্যেকবার রিপিট করা হয়েছে ব’লে চার গুণ দুই, এইট টাইমস। আমি স্বরলিপিতে ‘জাগে’-র প্রথম উচ্চারণগুলো ধরে বলছি: অন্য তিনটে জায়গায় “মা -পা –ধপা পমা(পা স্পর্শ স্বর)” গেয়ে দিয়েছ, একদম ঠিক আছে। কিন্তু ওই তৃতীয় ‘জাগে’ ? ৩০ নম্বর স্বরবিতান খুলে দ্যাখো, সে জেগে আছে অন্যভাবে --- “গা -মা –পধা পমা”।
কেন আছে?
কারণ একটা হতে পারে, রবীন্দ্রনাথ মহাশয় খুব সুবিধের লোক ছিলেন না। ‘আমি সোজা সুর করি, সব্বাই গাইতে পারবে’ বলে গায়ে ফুঁ লাগানো বাঙালিকে ডেকে-ডুকে গান তো ধরিয়ে দিলেন। তারপর একই কথার সুরের চলনেই এখানে-ওখানে উলটো প্যাঁচ মেরে আমাদের প্যাঁচে ফেলার ব্যবস্থাও সেরে রাখলেন সুন্দর রকম। আহা, সে পয়জার কঠিন কিছু নয়। কেননা, মরাল অফ দ্য স্টোরি এইটুকু, জলবৎ করে দিয়েছি মানে এই নয় তোরা আমার গানটা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গাইবি। বাঙালি হ’ল বেসিক্যালি কীর্তন-প্রজাতি, একই ঝোঁকে চোখ বন্ধ করে ধুয়ো টেনে যেতে ভালোবাসে।
তাই আনমনা ড্রাইভারের জন্যে রাস্তায় ছোট্ট ক’রে দু’একটা স্পিডব্রেকার ফেলে রাখলাম, ব্যাস্‌।
কিন্তু এটা আমাদের পর্যালোচনা। রবীন্দ্রনাথকে জিগেস করলে উনি কি সহমত হবেন? চান্স খুব কম। আচ্ছা, সুরের গুরু কী বলছেন?
গানটা প্রথম থেকে লক্ষ করো। আকাশ, সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ, অসীম কালের জোয়ার-ভাঁটা --- এদের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমার গান সবিস্ময়ে জেগে উঠছে। এই আশ্চর্যতাও আকারে উদাত্ত, কিং সাইজ। সেই জন্যে মাঝ সপ্তকের পঞ্চম থেকে নির্দ্বিধায় ওপরে উঠে যাচ্ছে স্কেল বেয়ে; ঝটকা দিয়ে নেমেও আসছে --- পঞ্চমকে সিকিভাগ ছুঁয়ে মধ্যমে দাঁড়িয়ে পড়াটা ভাবো। কিন্তু যখন এই গানেরই সঞ্চারীতে ঘাসে ঘাসে পা ফেলার কথা বললাম, বনের পথ আর ফুলের গন্ধের ছবি এল, তখন ওই ম্যাক্রোকসমস-এ ছড়িয়ে নেই আমি আর, ছোট সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম পৃথিবীর প্রতি অণুতে পা ফেলে হাঁটছি। সেখান থেকে উত্থিত আমার গানের যে অবাকপনা, সেটা কোজি, স্পর্শকাতর, মায়ামাখানো। তাই পঞ্চমের উচ্চতা নয়, গান্ধারের প্লুতস্বরকে শুরুর পৈঠা করছে সে। ফিরে আসতে গিয়ে ওই পঞ্চমেরই অর্ধেককে আঠালো পিছুটান মাখিয়ে রেখে এল। এই রহস্যময় মন্দ্রতা দিয়ে --- যেন কোনও বয়সিনী মেয়ে --- আমি আঁকতে চেয়েছি ভুবন-সঞ্জাত গানের জেগে ওঠাকে।
আবার দ্যাখো, গানটা ধাপে ধাপে উঠে ঘরের মায়া ছেড়ে ফের বৃহতের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে --- যেখানে সে ধরিত্রী-র সঙ্গে একাত্ম হওয়ার পরে জানার ভেতর দিয়ে আবার অজানাকে পেতে চাইল, মানে একপাক ঘুরে এসে পড়ল আকাশ, নক্ষত্র, বিশ্বজগতের ভেতর। সেখানে বিস্ময় জেগে উঠেছে আবার প্রথমবারের মতো সাহসী, অতিব্যাপক।
হয়তো এতক্ষণ নিজের মনের খেয়ালে কথা তৈরি করে গেছি। তবু এটুকু তো সত্যি যে, কোনও কুমার বা কুমারীর সিডি অথবা এই প্যানেলের বিচারকেরা তোমার রবীন্দ্রসংগীতে সুরের ভুল ধরিয়ে দিতে পারবেন না। তাই নিজেকেই সাবধান হতে হবে, ভাইটি।
স্বরবিতান খুলে শিখে নেওয়াই বুদ্ধিমান শিল্পীর কাজ।

No comments:

Post a Comment