Saturday, 16 April 2016

রিশিখোলা মুক্তি মোর্চা

রিশিখোলা মুক্তি মোর্চা
এক
‘ছোটিসি বাত’ ছবিতে অম্ল পালেকারের (আদর করে ডাকি) দশা ছিল অনেকটা আমার মতো।
শেয়ারের জিপ রিশি নদী পার হয়ে চেকপোস্টে দাঁড়ালে এ-ফোর কাগজ-রূপী চৌকো পাতলা কনস্টেবল গাড়িতে বিদেশি সওয়ারি নেই দেখে গেট খুলে দিল, জিপ সিকিমের ভেতরে ঢুকে থামল স্টপেজে। নেমে এসেছি, কিন্তু যাবোটা কোথায়! আধা-আর্ত ফোন কল ধরে ইকো-ট্যুরিজমের মালিক যা বললেন: পথই পথ দেখাবে, এগিয়ে আসুন।
ডিরেকশান বোলে তো প্রথমে একটা নুড়ি-পেছল শুঁড়িপথ ধরে নেমে যাওয়া, কোমর আর হাঁটু --- দুই নিজ-লাগেজের দায়িত্বসহ। নিচে রিশিখোলা, যাকে টপকে আপনাকে পুনরায় ‘পচ্চিমবঙ্গে’ ঢুকে পড়তে হবে। একটা যত-সরু তত-নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো পার হতেই বনপথ চট্টানে চট্টানে ঢাকা। তার গায়ে তীরচিহ্নের ছোটিসি বাত --- ইকো-কটেজ আর মাত্র বারো মিনিট।
এই সেই পঞ্চবায়ুর শুরু যা আসলে একটা সবুজ-বাদামি খাম। এই সেই সহজ সুর যার ওপরে পা রাখা চলে। পাখির উড়ে যাওয়ার ডাক, পাতা ঝ’রে পড়ার আলো, আর অহেতুক অনাস্বাদিত বুনোফুল। ডানদিকে রিশি-র মাথায় বুকে কোমরে পায়ের পাতায় অজস্র ঘুঙুর, কারণ সে জলের চেয়ে অনেক বেশি নিসর্গ-সংবাদ বয়ে নিয়ে বয়ে যাচ্ছে। তার পাড়ে মাথা নিচু হাঁটতে হাঁটতে টের পাই, দুপাশের পাহাড়ে সার লাগানো চিলোনি গাছের প্রত্যেকটা আসলে লামা পিস্তল তাক করা জলপাই উর্দির জওয়ান, পাথরের গায়ে ‘কিপ দিস প্লেস ক্লিন’ শব্দাবলীর মানে ‘ফেরার রাস্তা খুঁজো না’। আমি যুদ্ধাপরাধীর চেয়েও শোচনীয় অবস্থায় --- আমি প্রকৃতিবন্দী!
সাদা প্রজাপতি কোনও শান্তিসংকেত ছাড়াই উড়ে বেড়ায় চারপাশে, যেন আমার পরমায়ু একটা পরিপক্ক ফলের মতো হয়ে গেছে। আরও দেখি, বন তার গায়ের ঘামের গন্ধ পাল্টায়নি সেই ছোটবেলা থেকে, এবং একটু পরেই লম্বা হেলানো শীষওলা ঘাসের ব্যারাক আত্মপ্রকাশ করে। এক কাঠবাড়ির দোতলায় আমার সলিটারি কনফাইনমেন্ট, চোখের ঠিক নিচে তখন বিঠোফেন বাজাচ্ছে রিশিখোলা।
দুই
তুমি তো এখানে আসবেই কোনওদিন পুরুষবন্ধু নিয়ে; জানলা দিয়ে যখন দেখবে ক্ষয়াটে দুপুরে হাঁটুডুব নদীতে ডানা-শুকনো স্নান সারে বাচ্চা আর মা, বাবা দূরে ক্যামেরাধারী এবং নদীর ওপর কিছুটা বিরক্ত, তাকে ঠিকঠাক অ্যাঙ্গেল দিতে পারছে না ব’লে --- বুঝে নিও একটা প্রকৃতিপীঠ সামান্য পিকনিক স্পটে পর্যবসিত হয়ে কী মরমে মরেছে! সেই ধারা ধরা থাকবে কেটারিং কেতার দুপুরাহার পর্যন্ত, পরিবারশক্তিতে ভারি জনসমাজ যেখানে ডাইনিং রুমে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে খাদ্যশিকার করছে।
বুদ্ধিমান লজ-মালিক মুখে হাসি আর চোখে প্রশ্ন রেখে আমাকে বসায় বেলা গড়ানো ফাঁকা খাবার-টেবিলে। যেন আমি সিলসিলা-র লম্বা লোকটা যাকে গুরদোয়ারা পর্যন্ত প্রশ্ন করছে, ‘তুমি’ কোথায়? বলতে পারি না, তোমার সঙ্গে দেখাই হয়নি আমার কোনওদিন; প্রত্যেকটা সাক্ষাৎকার মহাশূন্যের অসংখ্য নেগেটিভ কণিকার মতো গড়েছে, ভেঙে গেছে।
ভাবতে ভাবতে নদীর বাতাসে টেবিল-ঢাকা উড়ে গিয়ে আমার ‘খানা খারাব’ আর মন ভালো করে দিল। কবে কোথায় এমন হয়েছে যে নুপূরের প্যাঁচ খাওয়া শুকনো পাতা অন্যমনস্ক দোয়েলের মতো নেমে এল ডালের বাটির পাশটায়? কিন্তু ছায়াছবির যে অংশ তখনও বাকি, খোলা উঠোনের বেসিনে হাত ধুতে মুখ নিচু করামাত্র দেখতে পাই --- বেসিনের নিচে জল বয়ে যাওয়া নালি বোগেনভেলিয়ার হলুদ পাপড়িতে ভরে আছে, ঝরা গোলাপের মেরুন ফুল ভেসে যাচ্ছে আমার কুলকুচি করা জলে! পৃথিবীর আর কোনও নর্দমা পুষ্পবৃষ্টিতে উপচে ওঠে বলে আমি তো জানি না...।
তিন
বিকেলে ধুম জ্বর এল। ঘরে চা দিতে এসে এগারো বছরের মহেশ সুব্বা (নাম, বয়েস আর দুষ্টুমির বিবরণ অপরিবর্তিত) টেনে তুলেছে আমাকে। তারপর এই রোগগ্রস্ত বুড়ো ছেলেকে ভোলাতে সে ছোট্ট ছোট্ট ফড়িং ধরে আর ‘দ্যাখো দ্যাখো’ বলে ফুঁ দিয়ে বাতাসে ওড়ায়।
--- ডানাগুলো ছিঁড়ে দিস না যেন!
মহেশ হাসতে থাকে।
--- জ্বর হয়ে তুমি কি অন্ধ হয়ে গেলে?
তাই তো! এইটুকুটুকু বাদামি ত্রিপত্র, তাদের বন্ধনী থেকে পাতাগুলো ওপরে উঠে আছে ব’লে ভাসিয়ে দিলে উড়ন্ত টেবিলপাখা বনবন করে ঘুরতে ঘুরতে চলে যায় অনেকদূর।
--- কী গাছের পাতা রে!
মহেশ মাটি থেকে তুলে দেখায় --- মৌয়া।
গতিষ্ণু প্রকৃতির ভেতরে এসে পড়েছি। নদী শুধু নয়, গাছ পথের নুড়ি সবাই হাঁটতে জানে এখানে। দৃশ্যত মৌন, কিন্তু নানা শব্দ শোনা যায় আকাশের।
সকাল সাড়ে ছ’টায় ঘরে ঘরে চা পৌঁছে তার দিন শুরু। তারপর ব্রেকফাস্ট রেডি হলে দরজায় ‘ঠকঠক’ দিয়ে আসা, পাতা কুড়োনো, জল তোলা, ফাইফরমাস --- এভাবে চার বেলা-ই...কখন স্কুলে যাস তুই!
কান না দিয়ে মহেশ বিছানার ওপর থেকে আমার খাতাটা টেনে নেয়: কী লিখেছো, পড়ো।
মণীন্দ্র গুপ্ত জিগেস করলেও আমি একইভাবে ব্লাশ করতাম।
--- ও এমন কিছু না, বাদ দে, বাদ দে...তাছাড়া তুই তো বাংলা জানিসই না।
--- কে বলল? সব ভাষা শেখা আছে। বাংলা, হিন্দি, নেপালি, ইংলিশ, জাপানি, চাইনিজ, এস্পা...এস্পা...।
স্প্যানিশ নিশ্চয়ই! গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ-এর তরফ থেকে ওর দুটো খোসাওঠা গোলাপি গাল টিপে দিয়ে বলি: কলকাতা যাবি আমার সঙ্গে? চল।
---কলকাত্তাকা নাম ভী মত লেনা, শা-লা!
মহেশের ওপর আমার শ্রদ্ধা এক সেকেন্ডে ছ’গুণ বেড়ে যায়...।
(চলিবেক...)

No comments:

Post a Comment