আমি রাবাঙালি হবো
এক
'বেরিয়ে পড়া'র স্বপক্ষে হাততালি সব সময়ই সীমাহীন, কিন্তু কখন তার অদায়েঁ আমাদের ঘায়েল করে দেবে? যখন সে সামনে বসিয়েছে ‘হঠাৎ ক’রে’। আবার, একটা সফরের মধ্যে থাকাকালীন তুমি আবার বেরিয়ে পড়তে সক্ষম। তখন, বাইরের বাইরে থেকে বাইরের ভেতরে যাওয়া। তেমনও ঘুরতে হয় --- টিভির রিমোট আর রুম সার্ভিস মিলে ভ্রমণ জেলখানা হয়ে গেলে। যেভাবে প্রেমে দাম্পত্যবিষ মেশে।
'বেরিয়ে পড়া'র স্বপক্ষে হাততালি সব সময়ই সীমাহীন, কিন্তু কখন তার অদায়েঁ আমাদের ঘায়েল করে দেবে? যখন সে সামনে বসিয়েছে ‘হঠাৎ ক’রে’। আবার, একটা সফরের মধ্যে থাকাকালীন তুমি আবার বেরিয়ে পড়তে সক্ষম। তখন, বাইরের বাইরে থেকে বাইরের ভেতরে যাওয়া। তেমনও ঘুরতে হয় --- টিভির রিমোট আর রুম সার্ভিস মিলে ভ্রমণ জেলখানা হয়ে গেলে। যেভাবে প্রেমে দাম্পত্যবিষ মেশে।
জীবনে আর কী কী লাগে জানি না, কিন্তু একটা ড্রাইভার! যার গাড়ির ট্যাঙ্কি খালি নয়, পেনড্রাইভে ভালো কালেকশান, কম কথা আর কোনওভাবেই তোমার অভিসারে কাঁচি চালাতে চায় না। বরং সে নিজেই এক প্যানোরামা। রাস্তার-ধার রেস্তোরাঁয় খেতে বসে ছুরি দিয়ে আলগা ক’রে পাহাড়সন্ধি --- চামচে ক’রে তার ফাঁক থেকে লেটুসপাতার মতো উদ্ধার করে আনছে হারানো পাইনবন। স্টিয়ারিং-সম্পদে ধনী সেই সুন্দর গুরুংয়ের স্লোগানই এইরকমঃ চলো ২৬ কিলোমিটার কি চলো ৪২ কিলোমিটার। ভাবতে ইচ্ছে করে, নেতাজি তার দিল্লি চলো ডাকের সঙ্গে আগাম দূরত্ব মেপে দিলে ব্যাপারটা আরও প্রেরণাদায়ক হতো কিনা। কেননা, সুন্দরও জানে, ওমুক লেক, তমুক মনাস্ট্রি আসলে বাহানা, স্টার হচ্ছে রাস্তার পাশের এই অনুসূচিত ফুলগাছ যার ‘নাম কী নাম কী’ করতে করতে শুকিয়ে উঠবে ক্যামেরার কন্ঠনালী! অথবা সিম্পলি সুবাতাস; ফুল নয়, গাছের গায়ের শার্টের গন্ধ। ভিজে ঠান্ডা একটা আহ্ থেকে অপরিসীম আহা পর্যন্ত মন ভালো হয়ে যাওয়া।
গ্যাংটকে দুদিন বসে থেকেও ইয়ুমথাং ওঠার ধস-বরফমুক্ত রাস্তা পাইনি। তাই ভ্রমণঘুড়ি ঘুরিয়ে ঢুকে পড়েছি অন্য আকাশে, পশ্চিম সিকিমের রাবাংলায়। ইতিমধ্যে ছুটির দিনগুলো প্রায় খেয়ে গেছে বলে ঠিক করলাম দিনরাতে বড়জোর দশ ঘন্টা হোটেলের মুখ দেখব, বাকি যা হবে --- পথিমধ্যে, যা হবে --- অন হুইলস্।
কিন্তু তুমি শুধু তীরে বসে মধুর হেসে চাকরি-বাকরির গল্পই শুনবে, হারিকেনের জং-পড়া আলোয়, ছেঁড়া বেডকাভারে আমার মাধ্যমিক পাশ জানবে না?
চলো, পাহাড়ে ওঠার রাস্তাটা একবার এঁকে দিই তোমাকে।
দুই
--- তিস্তা কে হয়, শুনি?
--- আপনার যা, আমারও তাই!
--- ইশ, আমি হাভাতে নাকি ওইরকম! চোখ তো সরাতেই পারছিলে না দেখলাম। গায়ে-ফায়ে হাত দাওনি তো?
--- ছিঃ! এটা ভাবতে পারলেন! এতটুকু ফেথ নেই আপনার? আমার পরে না হোক, মেয়েটার ওপর!
--- আপনার যা, আমারও তাই!
--- ইশ, আমি হাভাতে নাকি ওইরকম! চোখ তো সরাতেই পারছিলে না দেখলাম। গায়ে-ফায়ে হাত দাওনি তো?
--- ছিঃ! এটা ভাবতে পারলেন! এতটুকু ফেথ নেই আপনার? আমার পরে না হোক, মেয়েটার ওপর!
ধুলোমাখা চোখে সে তাকিয়ে থাকে। প্রচুর সাদা দেখেছে, কাজেই এখানে কবি নাম ধারণ করে এসে ‘ওকে নিয়ে লিখেছি’ বলেই তিস্তার রিভার-বেডে তাঁবু খাটিয়ে শুয়ে পড়া বাস্তুঘুঘু কিছু কম চেনে না।
তিস্তারা পাহাড়ে থাকত। তখন ওই বয়েসে ওই জ্ঞানে আমাদের পাহাড় মানেই দার্জিলিং। তো, দার্জিলিংয়ের মেয়ে সব সময় উল্টেই রাখত শুকনো ঠোঁটদুটো: ধুস, এখানে ভালো টপ হ্যাট পাওয়া যায় না; ভাল কুকিস, গুড কোয়ালিটি জ্যাম পাওয়া যায় না; লেদার জ্যাকেটস তো নেইই! ধুস, আমি দুবছর পরে ফিরে যাবো, কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি হবো গিয়ে।
কনভেন্ট মানে বড়লোকদের সেই বিদ্যালয় যেখানে টমাসকে থমাস বলা হয়। তিস্তা বলত।
তার অনেক পরে পাহাড়ে এসে বুঝেছি, কেন মেয়েটা জন্ম থেকেই নারী। প্রাইমারি স্কুলে দেখতাম, তখন আমরা ক্লাস থ্রি-ফোর, একই বেঞ্চে...কিরে, সরে বসতে পারছিস না?...মানে, তিস্তা। পার্বতী কি নীলিমার সঙ্গে মুখচাপা ফিসফিস করতে করতে হঠাৎ উলটো দিকে ঘুরে, এ-মা মেয়েদের কথা শোনে, লজ্জা করে না!...মানে তিস্তা-ই।
যে অপরাধ আমি করেছি, তার বিষয়ে কে না জানে। কিন্তু যে অন্যায় আমার ভেতরে নেই, অথচ ভবিষ্যতে এসে পড়তে পারে, তার জন্যে সেই ছোট্ট বয়েসে আগাম শাস্তি দিয়ে রাখতো সে!
তো, এবারও প্রত্যেক ছোটবেলার মতো আমি দেখার আগে আমাকে দেখে ফেলেছে তিস্তা। ওমনি প্যাঁক প্যাঁক করে উটপেনসিল-রং হংসী দুই পাহাড়ের পায়ের পাতার মধ্যে প্রণামের মতো ঢুকে পড়ল। পাগলা হাতির আদল সেই পাহাড়শ্রেণীর গুলি-বেঁধা একখণ্ড শরীরই ছিটকে এসে পড়েছে মাঝ-রাস্তায়। কখন ধস সরবে, সার দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে।
আমার সঙ্গে সংলাপ যার ---এই বৃদ্ধও এক পুরনো ভাঙন, উলটো দিক থেকে গড়িয়ে খাদের পাশে থেমে থাকা। তার গায়ে ফার্ন, পাখির পালক আর বৃষ্টির দাগে আলতো হাত রেখে বলি শুনুন, মিথ্যে বলব না, তিস্তার বুকের কাছে নেমে এসেছিলাম একবার, রংপোতে। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, দুপাশে পেস্তার কেয়ারি করা কেকের টুকরো। তারপর তিস্তার ডানে আর আমার বাঁদিকে যেখানে সিকিম মনিপাল ইন্সটিটিউট, জঙ্গলের গন্ধ শুরু হল। সবার চোখ এড়িয়ে অরণ্যের ব্রীড়ার মধ্যে প্রবেশ করলাম দুজনে...। সে গল্প নামার সময়ে বলে যাব, আগে রাস্তা খালি করুন প্লিজ, সেরে আসি টোটোপনা।
তিন
বহুদিন আগে একবার পাহাড়ে যাব, হলদিবাড়ি এক্সপ্রেস দুপুরে ফরাক্কা পেরোচ্ছে দেখে দরজার কাছে এলাম। একটা অবাঙালি ছেলে পাদানিতে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে নিচে তাকিয়ে আছে। তার পায়ের নিচে সেতু, সেতুর নিচে বাতাসের দীর্ঘ এক জমজমা, বাতাসের নিম্নে বুনিয়াদি জল। হঠাৎ পেছনে মুখ ঘুরিয়ে সে মুগ্ধ চোখে বলে উঠেছে, পানি বহুত হরকত কর রহী হ্যায়। গা শিউরে উঠল আমার। ওমনি চোখের সামনে স্ক্রিন পালটে গিয়ে এসে বসেছেন বীণাবাদিনী। তার মিল্কমেড শাড়ি, পাড় তানপুরো রঙের। একটু জোরে বইছে বাতাস, তাই আওচার সেরে বুকের আঁচল ঠিক করে নিয়ে তিনি রাগের অন্তরা ভরতে চললেন।
বহুদিন আগে একবার পাহাড়ে যাব, হলদিবাড়ি এক্সপ্রেস দুপুরে ফরাক্কা পেরোচ্ছে দেখে দরজার কাছে এলাম। একটা অবাঙালি ছেলে পাদানিতে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে নিচে তাকিয়ে আছে। তার পায়ের নিচে সেতু, সেতুর নিচে বাতাসের দীর্ঘ এক জমজমা, বাতাসের নিম্নে বুনিয়াদি জল। হঠাৎ পেছনে মুখ ঘুরিয়ে সে মুগ্ধ চোখে বলে উঠেছে, পানি বহুত হরকত কর রহী হ্যায়। গা শিউরে উঠল আমার। ওমনি চোখের সামনে স্ক্রিন পালটে গিয়ে এসে বসেছেন বীণাবাদিনী। তার মিল্কমেড শাড়ি, পাড় তানপুরো রঙের। একটু জোরে বইছে বাতাস, তাই আওচার সেরে বুকের আঁচল ঠিক করে নিয়ে তিনি রাগের অন্তরা ভরতে চললেন।
গত পরশুর শেষ দুপুরে যখন গ্যাংটক উঠব বলে বেরিয়েছিলাম, তিস্তার কোলে চোখ পড়তেই বুঝেছি সে এক লয়দার বহলওয়ার মধ্যে আছে। সূর্যের আলোয় চিকচিকিয়ে উঠছে ফেনার এক একটা ফ্রেজ; যেখানে নিচু উপত্যকার দিকে গেছে পাহাড়, সেখানে তিস্তার ঘূর্ণিতে লরজদার ভারি তান ছুটছে। নিসারে নি সারে সা নি --- এই স্বরগুচ্ছে পরিষ্কার বেহাগ। আরও একটু ওপরে উঠতেই স্রোত গান্ধারে ন্যাস রেখে রেখাবে কণ্ ছোঁয়াবে। আহ্, আমি মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম...।
চার
কবে থেকে ভেবেছি, এই কাট্টুসকে একবার দেখে নেব। যেখানে ফুলগাছ নেই, সেখানে যদি একতোড়া মেয়ে খোঁপায় ফুল গুঁজে সার সার দাঁড়িয়ে যায়, সেও তো বিকল্প সৃজন! ভেবেছিলাম, বাতাসে প্রচুর পরাগ-সংখ্যক আলো এনে দেবার জন্যে আমার হাত দুশো ফুট উঁচু করে এদের মাথায় সূর্যের স্তব পড়ে দেব একবার।
কবে থেকে ভেবেছি, এই কাট্টুসকে একবার দেখে নেব। যেখানে ফুলগাছ নেই, সেখানে যদি একতোড়া মেয়ে খোঁপায় ফুল গুঁজে সার সার দাঁড়িয়ে যায়, সেও তো বিকল্প সৃজন! ভেবেছিলাম, বাতাসে প্রচুর পরাগ-সংখ্যক আলো এনে দেবার জন্যে আমার হাত দুশো ফুট উঁচু করে এদের মাথায় সূর্যের স্তব পড়ে দেব একবার।
তারপর যেহেতু পাহাড়ের রাস্তাগুলো স্প্যানিশ গিটারের তার বেঁকিয়ে তৈরি, আমি উঠতে-ঘুরতে একবার দেখি বিশেষ কোনও অধ্যায়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে আলোছায়ার বাঘছোপ। আলোর অন্তর্নিহিত হলুদ, ফুলের আভাময়ী হলুদ, তার সঙ্গে কুয়াশার ফরম্যাল ধূষর আর ছায়ার শক্তিশালী বিবর্ণতা মিশে বাগান তৈরি হয়েছে। ধুলোর চেয়ে পথে কিলাউরি-র বালুতট বেশি...তখন কেউ বলে এটা কাট্টুসের বন। নিজের অনুভবের বাইরে আছে যে দৃশ্য, তাকে অবলোকন এক জিনিস, আর আজ দৃশ্যের ভেতরে বসে থেকে দেখছি তাকে!
মনে পড়ল, যখন তোমাকে বুকে ধরে যত্ন করেছি কোনও দুপুর বারোটার গোধূলিতে --- মাথার সিঁথি থেকে পায়ের কড়ে আঙুল পর্যন্ত যে আদরপ্রপাত পৃথিবীর দীর্ঘতম, তার গিঁট খুলে দিতে গিয়ে সেই মুহূর্তে হঠাৎ মনে হতো, তুমি হয়তো কিছু পরে একটা হলুদ-নীল শাড়ি পরে আমারই সঙ্গে রাস্তায় বেরোবে। এই তুমিকে আমি কি আর খুঁজে পাবো? সেই শরীরে? এই পোষাকহীন পরিচ্ছদ, কোমরের ডৌল, ঠোঁটের বিভা আর স্তনের সুউচ্চ নরমতাও যেন কীভাবে বদলে যাবে সেই সামাজিক রোদ্দুরের ভেতর, অচেনা হয়ে যাবে।
এখনও কতোটা সৌন্দর্য আঁকা আছে বাতাস-বিমানে, কুয়াশা-প্যাসেঞ্জারে, উদ্ভিদ-অবরোধে --- দেখার তেষ্টায় ছুটে আসি তোমার কাছে টাকা অগ্রাহ্য, শরীর অগ্রাহ্য; কিন্তু ও ঝর্নাতল, হে উইপিং ফার্নেরা, আমি বুঝতে পেরেছি, যেভাবে শামুক ঘরের মেঝেয় হেঁটে গেলে পেছনে একটা ঠোঁটচাপা মায়াবি ভিজে রেখা পড়ে থাকে, তেমনি সৌন্দর্যের চলন শুরু হয়েছে আমার উঠোনের পেয়ারাপাতার ফ্রেমে বাঁধানো রোদ্দুর, আমার জানলার পাখিডাক থেকে। খুব নিকট-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে ধ্বংস হয়ে যাওয়া আমার প্রেম থেকেও। তোমাদের দেখতে না পেলে আমি যে কবেই অন্ধ হয়ে যাই!
পাঁচ
রাবাংলার বুদ্ধ পার্কের দিকে যে রাস্তার গতি, তার মাঝখানে সাদা বর্ডার --- পথের পৌষ্টিক নালি শুয়ে আছে।
রাবাংলার বুদ্ধ পার্কের দিকে যে রাস্তার গতি, তার মাঝখানে সাদা বর্ডার --- পথের পৌষ্টিক নালি শুয়ে আছে।
এল তাশিডিং। সেখানে কোনও ডিং ডং স্কুলের ঘন্টা শুনিনি। দুকিলোমিটার চড়াই ভেঙে মনাস্ট্রি দেখা বারণ হল। কিন্তু তার আগে মিশে গেছে রঙ্গিত আর লোডংখোলা। রাজযোটক। পাহাড়ের সম্মতিতে, পাহাড়ের ব্যবস্থাপনায়, পাহাড় সেখানে তন্ত্রধারী। রঙ্গিতকে দেখা একটু চেনা চেনা লাগছিল। তারপর মনে পড়ল, ওহ্, বিরাট কোহলি। একই ধরণের জলের ছাঁট, হাঁটাচলার কায়দা, ঢেউগরম বুদবুদ!
তাশিডিংয়ের গায়ে একটু থেমে দাঁড়িয়েছিল বোলেরো। পঞ্চম ছুঁয়ে আবার কোমল ধা-য় উঠে আসে, আরিথং যার নাম। যার চেহারা চোখলজ্জার লাল পুষ্প, রডোডেনড্রন! তোমাকে দেখব বলে আমার সোনাজয়ী দৌড় ছিল, ভ্রমণসঙ্গীর এপাতা-ওপাতা ফর্দাফাঁই মুখস্থ ছিল, অথচ সেই সুউচ্চ উচ্চতায় তোমার পুরো মুখচ্ছবি আমি ক্যামেরায় ধরে নিলাম না, অর্ধেক রাখলাম তোমারই জন্যে। কেননা মনে হল নিঃঝুম লাল খুব বেশি ফোটেনি এখনও, সঙ্গীসাথীর ঢাক বাজছে না, সামনে প্যান্ডেল যদিও উঁচু তুষারমুকুটে, আর দূরে গুম্ফার মাথায় ইঁদুর-পতাকা।
তারপর ইয়কসামের টেরিটোরিয়াল বন শুরু হল হিংস্রতাহীন, কোনও ভালুকের লোম, কোনও হায়নার মাংসপেশি ছাড়াই। আর পথের বাঁক ফিরতে ফিরতে যখন কৃষ্ণসার হয়ে পড়েছি নিজেই, গাড়ি আমাকে খুলে দিল ফামরং জলপ্রপাতে। কাছে পৌঁছনোর সিঁড়ি আছে কিন্তু এই ঝোরা আমার মতো নয় তো, যার নিকটদর্শন মানেই বিকটদর্শন? গুছিগুছি আগাছার সন্তর্পণ মাড়িয়ে উঠতে থাকি, এত রঙিন প্রজাপতি ওড়ার স্কেচপেনরেখা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে।
অনেক উচ্চতা বেয়ে, ছবি তোলার অজুহাতে জিরোন খেয়ে, জিরোনের বদান্যতায় অর্কিড সমাহারে মুগ্ধতার দুচারটে গন্ধপুষ্প ছুঁড়ে দিয়ে যেখানে উঠে এলাম, সে এই লোমশ ক্ষিপ্র জলপ্রপাত দেখার ওয়াচটাওয়ার। কেননা গোটা জঙ্গল খুঁজে এই একটাই শ্বাপদ পেয়ে যাই আমি, জলের প্রত্যেক শ্বেতকণিকা আসলে যার ক্যানাইন টিথ। আর আশ্চর্য হই, ধুলোজমাট সেই দেয়ালহীন গোলঘরে পড়ে আছে কয়েকটা পোড়া কাঠের চ্যালা!
তার মানে কোনও জুটি এখানে রাত কাটিয়ে গেছে... কাঠের আগুনে চিতাবাঘ, পাইথন বা শীতই শুধু দূরে সরাতে চায়নি, দেখতে চেয়েছে নিজেদের আশ্লষের মুখ! তেমন একটা জায়গা বেছে নিয়েছে, যেটা পৃথিবীর বাইরে, মহাপ্রকৃতির। সময় আর সমাজের ফ্রেম ভেঙে দিয়ে এই সেই বেরিয়ে পড়া, পরিধি থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ভিতরকণিকায় শুভভ্রমণ।
ছয়
তখন খসখসে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সন্ধে শুরু তার মাত্র কয়েক গজ পরে। আমি জঙ্গলের হৃদয়ের সন্ধের কথা বলছি।
ড্রাইভার ভয় দেখাচ্ছে, ‘জানে-আনে মেঁ’ এক ঘন্টা লেগে যাবে।
তখন খসখসে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সন্ধে শুরু তার মাত্র কয়েক গজ পরে। আমি জঙ্গলের হৃদয়ের সন্ধের কথা বলছি।
ড্রাইভার ভয় দেখাচ্ছে, ‘জানে-আনে মেঁ’ এক ঘন্টা লেগে যাবে।
আমি পুরুষাঙ্গের মতো প্রবেশ করি সেই কালো নির্জনতায়, শেষমুখে উদ্গীরণ --- বেনডেন্টসে রাজপ্রাসাদ --- দেখতে পাবো। এম ভি আন্দামান তিন দিন টানা সমুদ্রে ঢুকে আসার পর জলে যে তরঙ্গ পাওয়া যায়, একটা গুঁড়িশুঁড়ি রাস্তায় তেমনি থমথমে ওঠবস করতে করতে এগোচ্ছি। জলবিন্দুর জায়গায় শুকনো পাতার বাদামি ফোঁটা, সেই এক-দুই...ত্রিস্তর বিস্তারের ওপর পা চালাই। কিন্তু দুপাশের ঝুরি-নামানো, লতা-দোলানো অন্ধকার আলোর ধমনীকে শতকরা সাতানব্বই ভাগ বন্ধ করে বসে আছে, কাজেই আলোও অতি-সন্তর্পণ, সামান্য নড়াচড়ায় সে নিজেকে খুইয়ে না বসে!
গলিটাকে দু’পায়ের পক্ষে উচ্চারণ করা ক্রমাগত কঠিন হতে হতে চোখে পড়ল আবছায়ার ধার ঘেঁষে খয়েরি পোষাকের মাথায় টুপি পিঠে পাহাড়ি মোট মানুষটা একলা উলটো ঘুরে বসে আছে। তাকে রাস্তা জিগেস করতে যাবো, আরেহ্, সে এক অর্ধেক কেটে ফেলা গাছ, আপনা থেকে তৈরি ভাস্কর্য!
ঠিকই তো। গাছ না কাটলে মানুষ হয়?
তখন আমাকে নিয়ে ভাবনা শুরু হল জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ারও। যেমন শ্রাবণের ছুটির বিকেলে হঠাৎ চেয়ারটেবিল চায়ের কেটলি নড়ে উঠলে বয়স্ক মহিলা জিভের তীব্র উলু পড়তে থাকে, রাস্তার পাশে নীল বোর্ডে তারা অবিকল সাদা হরফের শাঁখ ফুটিয়ে রেখেছে: ভয় পেও না, আর মাত্র পাঁচশো মিটার!
গাছের নিরাপোষ সাদা কাণ্ডের পাশ দিয়ে রাস্তাটা এখুনি আমাকে উগরে দিল যে খনন চত্বরে, সেটা এক চোর্তেন। পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠেছে মূল প্রাসাদের দিকে, বাঁয়ে সরকারি দপ্তরের সংগ্রহশালায় মাটি খুঁড়ে পাওয়া ভাস্কর্য সাজানো। কিন্তু এখন সবাই বৃষ্টি-কুয়াশা-মেঘের ত্রিপিটক আক্রমণের মুখে। কাত হওয়া ছাতা দিয়ে জ্যাকেট, আর ভিজে জ্যাকেটে ছাতার কাজ সারছি। তার মধ্যে খুব সুন্দর করে, খুব অবারিত করে রাখা হয়েছে রেলিকস্সকল, লম্বা মনোহর দেয়াল আর পাশে তিনটে ছোট্ট চোর্তেন ডিঙিয়ে উল্টোদিকে প্রাসাদের জন্যে উপাসনা মন্দির।
কুয়াশার মণ্ড ভেসে যাচ্ছে আমার আজু-বাজু দিয়ে, অল্প জলে নিরামিষাশী বিস্কুট তৈরির আগে যে মাখা-টা হয়, মেঘের সেই “ড” গড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বৃষ্টির মেশিনে। টের পাই, প্রকৃতির মূল গ্রন্থিগুলো এখানে খোলা, নগ্ন, উচ্ছ্বসিত, যেন নিজের ঘরের উঠোনে বসে আছে। আর রাগি পি.টি. টিচার বাতাস পাইন গাছগুলোকে ডাইনে-বাঁয়ে দুলিয়ে ফ্রিহ্যান্ড করিয়ে নিচ্ছে খুব।
ধ্বংসস্তূপের ওপরে উঠে এসে প্রথমটা এত লাল রেলিং, পরিচ্ছন্ন ছাঁটা ঘাসের ওয়েল-বিহেভড খন্ডহর দেখে মুষড়ে গেছিলাম। কোথায় সেই গিরগিটি-পালানো, দু’শতাব্দী সাবানস্নানহীন অতীতের হাড়পাঁজর? তারপর মনে হল, অস্তিত্বের তো এমনই ঝকঝকে থাকার কথা যখন সে ভয়ানক পুরাতাত্ত্বিক জঙ্গলের অতীত পার হয়ে আসতে পেরেছে।
নিসর্গের ফার্মহাউজ এটা। পাহাড়ের কনফারেন্স হল। এখানে প্রকৃতি উৎপন্ন হয়ে দিকে দিকে পরিবেশিত। আমি নিসর্গের কোর এরিয়ায় এসে তার খেলার কোর্টেও ঢুকে পড়েছি, আর রেগে গিয়ে আমকে এক্ষুনি মোর করে দিতে চাইছে সে। সারা সশরীরে বৃষ্টির বাড়ি খেতে খেতে বুঝতে পারলাম, রাজধানী ও হাভেলি এখনও অসাধারণভাবে বর্তমান। বেনডেন্টসে রাজবংশের হাত থেকে তাকে শুধু কেড়ে নিয়েছে পাহাড়ি প্রকৃতি।
সাত
রোদ ফিরেছে। গাড়ির কাচ নামিয়ে মনে হয় এই ফার্ন আর ঘাসফুলের অসহায় দোদুল্য পাইপ বা খদ্দেরহীন দোকানের চাউমিন, এরা কি আমার কখনও কেউ ছিল, বন্ধু বা আত্মীয় লাগত আমার? অথবা আমিই ভেতরে ভেতরে ওই কানঝোলানো লোমাতিশয় খুদে খুদে চারটে পা? বাচ্চা ছেলের ঠোঁট থেকে প্রকাশিত ভোর-কুয়াশার সিগারেট?
রোদ ফিরেছে। গাড়ির কাচ নামিয়ে মনে হয় এই ফার্ন আর ঘাসফুলের অসহায় দোদুল্য পাইপ বা খদ্দেরহীন দোকানের চাউমিন, এরা কি আমার কখনও কেউ ছিল, বন্ধু বা আত্মীয় লাগত আমার? অথবা আমিই ভেতরে ভেতরে ওই কানঝোলানো লোমাতিশয় খুদে খুদে চারটে পা? বাচ্চা ছেলের ঠোঁট থেকে প্রকাশিত ভোর-কুয়াশার সিগারেট?
রোদ ফিরেছে। কিন্তু, নিজের সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এমন এক অনবদ্য ঘটনা, সরষে থেকে তেল বেরিয়ে যাওয়ার মতো। তেলকল মালিক বেঁচে থাকতে এ-সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়ার নয়। কাজেই, আমি সিদ্ধান্তে এসে পড়ি যে, ঈশ্বরভাবনায় যেমন, প্রেমেও নিজেকে নিজের চেয়েও বড় অন্য কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া, নিজের কেন্দ্রকে অন্যের ভেতরে দেখে চাওয়ার ইচ্ছেই সত্তার সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়েছে। পালপোষ করেছে হীনমন্যতাকে। তাই প্রেম ভেঙে যে ভীষণ নেগেটিভ শক্তি জন্ম নেয়, তার সাহায্য নিয়ে সত্তার অখণ্ডতাই গড়ে ওঠে একটু একটু করে।
অণু তৈরির সময়ে পরমাণুর ঘরগুলো ওভারল্যাপ ক’রে যায় তো অন্য একটার সঙ্গে? আর যে পরমাণু যত অস্থায়ি, সে ততো ওভারল্যাপে যেতে চায় স্থির হবে বলে? এভাবে যে যৌগ তৈরি হল তাকে আমরা প্রেম ডেকেছি। একই নিয়মে, যতরকম নাম রয়েছে সম্পর্কের --- ভালোবাসা, বিয়ে বা মুক্ত যোগসূত্র --- তার মধ্যে সেটাই সেরা যেখানে দুজনে সমানভাবে দুটো ইলেকট্রন-মেঘ নিজেদের শরীরে মেখে নেবে। তো, আমার এমন সত্তাজোড় যখন ভেঙে গিয়েছিল, বুঝতে পারিনি, কেউ বোঝে না, কোন টুকরোটা আমার, কোনটা ওর! যে অংশ যন্ত্রণায় চিৎকার করছে, সেকি আমি, না ও? যে ফালিটা দ্রুত অন্য সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে পড়ে ভুলে যেতে চাইছে অতীত, সে কি ও, না আমি?
এইসব ভেবে আমি দেখি, ড্রাইভার এক-কিরণ শূন্যতার কাছে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে। কখন ঝটকা মেরে তুলোর ঝালর সরে যাবে, করোটির সাদা নিয়ে বেরিয়ে আসবে চূড়াগুলো আর নিচে অনেক সন্ততির মতো ঝাউগাছ --- জানে না মানুষ। সেখানে অনেকে একসাথ হয়ে ছবি তুলছে পাহাড়ের, মুখে বিস্ময়ের এককোটি প্রতিশব্দ!
তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগলাম, তোমরা উলটো দিকে লেন্স ঘোরাও, যেহেতু কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়ে অনেক দেশবরেণ্য ঘটনা এখানে দাঁড়িয়ে। প্রচুর কম শক্তির সে, উচ্চতা নেই, বাইনোকিউলার-ভর্তি সৌন্দর্য নেই, যে কোনও উড়ান তার মাথা ডিঙিয়ে যায় আরামসে। সে আহত হলে কোনও পরিবেশবিদ্যা ছুটে আসবে না, তবু ওই তুষারচুড়োর চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক বৃষ্টিমারুৎ, চক্রবাত আর সৌদামিনী তাকে ঢেকে দিয়েছিল। হাত ধরে সসম্মানে পৌঁছে দিয়েছিল মেট্রোর তৃতীয় রেলে, শার্টের পকেটে নতুন-কেনা ব্লেড গুঁজে দিয়ে ঘরের দরজায় বাইরে থেকে হাঁসকল টেনে বেরিয়ে গিয়েছিল বড় রাস্তায়। সেই সমস্ত নশ্বর সূর্যাস্ত সামলে, অর্ধেক হয়েও পূর্ণের নাম ধ’রে বেঁচে থাকার জন্যে সে এখনও আছে।
তোমরা তার ছবি তোলো, বন্ধুগণ।
No comments:
Post a Comment