Saturday, 16 April 2016

পৃষ্ঠা বনাম প্রচ্ছদ

পৃষ্ঠা বনাম প্রচ্ছদ
এক
আমার মনে একটা রূপকের কল্পনা আছে --- যে-কোনও দেশই একটা কিতাব। সেই বইয়ের পাতাগুলো হচ্ছে জনগন আর মলাট রাষ্ট্র
তাহলে দাঁড়াল যে, নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কনটেন্ট আর কাভার-এর। প্রচ্ছদের ছবি, রঙ বা লেটারিং, সেটা পেপারব্যাক হবে না শক্ত মলাটের --- বইয়ের বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করার কথা। অথচ, বাস্তবে বাধ্যতামূলক নির্ভরতার গল্পটা ঠিক উলটোরকম
ভেবে দেখুন, প্রচলিতভাবে আমরাও সবসময়রাষ্ট্র জনগনউচ্চারণ করে থাকি, মানে, ঘোড়ার আগে জুড়ে দিই গাড়িটাকে। কাজেই এটা মেনে নিতেই হবে যে, রাষ্ট্রের পরিচয়েই নাগরিকের আইডেন্টিটি। আমেরিকা দাদাগিরি ফলানো একটা দেশ, কারণ সেই দেশের রাষ্ট্র দাদাগিরি করে। পাকিস্তান ভারতবিদ্বেষী, কেননা সে দেশের সরকার ভারতকে মোটেই পছন্দ করে না --- ব্যাপারটা এই রকম। এই প্রক্রিয়ায় আস্তে আস্তে শীত জাঁকিয়ে বসে, তারপর বইয়ের পাতাগুলো ঝরে যায়; ফুটপাথের দোকানের ফিস কাটলেটের মতো মলাটসর্বস্ব হয়ে পড়ে দেশেরা
দুই
এতদিন দুই দেশের যুদ্ধ বলতে আমরা জানতাম, এক মলাটের সঙ্গে অন্য মলাটের ধাক্কাধাক্কি। কিন্তু আধুনিক সন্ত্রাসবাদ এসে লড়াইয়ের নিয়মে বদল এনেছে। সন্ত্রাসবাদী সমর মানে এক বইয়ের প্রচ্ছদের সঙ্গে অন্য বইয়ের পৃষ্ঠাগুলোর সংঘর্ষ। (জঙ্গী সংগঠনকে প্রচ্ছদ বলছি এই জন্যে যে তার চরিত্র অবিকল রাষ্ট্রেরই মতো)
এই হামলায় সাধারণ মানুষ পড়ে দুটো অসুবিধেয়। ) সে অরক্ষিত, সফট টার্গেট বলে বেঘোরে প্রাণ হারাতে থাকে। ) তার নিজের রাষ্ট্রও সুযোগ পেয়ে যায় আর একটু জাঁকিয়েবসার। যে-কোনও সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পরে নির্বিচার ধরপাকড়, অমানবিক অর্ডিন্যান্স তৈরি করা বা নিরাপরাধ মানুষের হয়রানি সে কথা প্রমাণ করছে
ফ্রান্সে টেররিস্ট হামলার দিন কয়েকের মধ্যে ফরাসি সরকার বিনা বাধায় কয়েকটা নতুন আইন পার্লামেন্টে পাশ করিয়ে নেয়, যেগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় প্রণয়ন করতে তাদের কালঘাম ছুটতো। একটা অর্ডার অবশ্যই বর্ডার সিল করে দেওয়া, পাশাপাশি বন্ধ হল ফ্রান্সে সব রকম শরণার্থী প্রবেশ। কাজেই, যে সিরিয় উদ্বাস্তুরা সে-দেশে জায়গা পাচ্ছিল, তাদের চোখে কোথাও ফ্রান্স আর আইসিস-এর ভূমিকা হয়ে উঠল সমান-সমান!
আমার কাছে জঙ্গী হামলার সবচেয়ে ভয়ানক প্রভাব এই যে, জনগনের ভূমিকা ছোট হয়ে আসতে আসতে একেবারে মুছে যাওয়ার অবস্থা হয়। আগেকার ধ্রুপদী যুদ্ধে বিজিত দেশ ক্ষমতা হারাতো, জয়ী দেশ সেখানে কলোনি তৈরি না করলেও অর্থনৈতিক সুবিধে ছিনিয়ে নিত অনেকখানি --- তার উল্টোদিকে গিয়ে সন্ত্রাসবাদী লড়াইতে দুটো রাষ্ট্রই ক্ষমতা বাড়িয়ে নিচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্বময় শক্তিশালী হচ্ছে রাষ্ট্রব্যবস্থা। ভালো প্রকাশন সংস্থার বইতে আমরা দেখেছি, এতো সুন্দর মানের কাগজ-ছাপা-বাঁধাই থাকে যে, হালকা সুচারু পেপারব্যাক কাভারেই বইটা সুরক্ষিত। ঠিক তেমনি রাষ্ট্রেরও লক্ষ্য হওয়া উচিত সে-দেশের নাগরিকের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হয়ে ওঠা। কারণ, সংস্কৃতি শব্দটার পেছনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাম্য আর অধিকারের ছবি উচ্চারিত
তা না হয়ে স্টেট হয়ে দাঁড়াচ্ছে মিলিটারি-মুখ, দেশের বাইরে, দেশের মধ্যেও। সেই ফাঁকে 'জনগন' নামের পাবলিক প্রপার্টি লুঠ হয়ে যাওয়ার জোগাড়!
তিন
মিশেল ফুকো- সঙ্গে একবার আলোচনায় বসেছিলেন পিয়ের ভিক্টর (ফুকোরনলেজ/পাওয়ারবইয়ের প্রথম লেখাটা) এই ভিক্টরেরই আরেক নাম বেনি লেভি, যার নেওয়া জাঁ পল সার্তের সাক্ষাৎকার কবি অরুণ মিত্রের অনুবাদেশেষ সংলাপনামে আমরা অনেকেই পড়েছি। বৃদ্ধ সার্ত-এর ওপর মাওবাদী লেভির প্রভাব এতোদূর ছড়ায় যে সিমোন দ্য বোভোয়াও সেই বাড়াবাড়ি নিয়ে বিরক্ত মন্তব্য করছিলেন
যাই হোক, ভিক্টরের সঙ্গেপপুলার জাস্টিসনিয়ে মিশেল ফুকোর মত কিছুতেই মিলছিল না। ১৯৬৮- ফ্রান্স সেটা, বিপ্লবী জন-আন্দোলন চলার সময় সর্বহারা জনতা কিভাবে জনগনের শত্রুর বিচার করবে সেই বিষয়েই ভাবনা-চিন্তা চলছে দুজনের। ভিক্টর চাইছিলেন, চিনা মডেল অনুসরণ করে দুই দলের মধ্যে চায়নার রেড আর্মি- মতো একটা মধ্যস্থতাকারী কোর্ট বসানো হোক। আর ততোবারই ফুকো বলতে থাকেন, কোর্ট মানেই সে বুর্জোয়া ইডিওলজি ঢুকিয়ে দেবে সর্বহারার মনের ভেতর। যেমন বুর্জোয়া কোর্টের কাজই ছিল সর্বহারা লুম্পেন সর্বহারার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করা। সারা জীবন ধরে প্রান্তিক মানুষদের প্রতি অসীম মমতা-মাখা মিশেল ফুকো একবারও লুম্পেন শব্দটা উচ্চারণ করেননি ইন্টারভিউতে (ভিক্টর একবার বলেছিলেন), সারাক্ষণ ডেকে গেছেনআনপ্রলেতারিয়েত মোট কথা, বিপ্লবী জনতা আর তার প্রতিপক্ষের মধ্যে কোনও তৃতীয় শক্তিকে থাকার জায়গা ফুকো দেবেন না
কানহাইয়া কুমারের ওপর সরকারি কোর্ট চত্ত্বরে যখন আইনজীবীরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তখন মনে পড়ল ঘটনাটা! খুব দুঃখ হল। শেষ পর্যন্ত মধস্থতাকারীরা বিদায় নিতে চলেছে ভারতীয় বিচারব্যবস্থা থেকে, উনি জানলে যে কী খুশি হতেন!
চার
রাষ্ট্র একটা আইনস্বীকৃত অস্তিত্ব। সাধারণভাবে, জনগন আর রাষ্ট্র মিলে দেশ হয়। পৃষ্ঠা আর মলাট একসাথ হলে বই --- যে রূপকের ব্যবহার আগে করা হয়েছে। দেশ স্বতঃস্ফূর্ত অস্তিত্ব। ভারতীয় গণতন্ত্রে দেশকে দেখাশুনো আর চালানোর দায়িত্বে কোনও সরকার নির্বাচিত হন পাঁচ বছরের জন্যে। এরা আসলে এক বা এ্কাধিক রাজনৈতিক দল। তাহলে রাজনৈতিক দল বদলে গেল রাষ্ট্রিয় সরকারে
কিন্তু রাষ্ট্রিয় সরকার কি রাষ্ট্রে বদলে যেতে পারে? না, কখনওই নয়। চেয়ার খালি হয়েছে, আমি গিয়ে বসলাম। তাতে আমি চেয়ারটা হয়ে যাই না কিন্তু
রাষ্ট্রের প্রতিনিধি সরকার নয়, সংবিধান। সরকার জনগনের প্রতিনিধি
রাষ্ট্রিয় সরকার সেই বাঁধাইয়ের মতো, কনটেন্ট আর কাভারের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা রাখা যার কাজ। যেহেতু রাষ্ট্র এক স্থির ধারণা আর নাগরিক একটা পরিবর্তনশীল মূল্যবোধ, এবং পৃষ্ঠার লেখা পালটে গেলে প্রচ্ছদের গঠনও অন্য হয়ে যাবে, তাই জনগনের ইউনিয়ানের নেতা হিসেবে সরকারের দায়িত্ব হল সময়মতো রাষ্ট্রিয় কাঠামোতে বদলাও আনা
কিন্তু মুশকিল এই, সব প্রতিষ্ঠানের মতো সরকারও এক লাভজনক সংস্থা। ভৌগোলিক আয়তন, মিলিটারিবাহিনি আর অর্থনৈতিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে স্থায়ি হয়ে উঠতে চায় সে। প্রতিষ্ঠান চাইবে অধিকাংশ নাগরিককে তাদের গ্রাহক বানাতে। প্রত্যেক রাষ্ট্র, মানে অন্তর্গত সরকারেরও মেজরিটির মন পাওয়ার নিজস্ব প্রকল্প আছে। খবরের কাগজের লক্ষ্য যেমন সবচেয়ে বেশি কাটতি, সরকারের উদ্দেশ্য সর্বাধিক ভোট। অথচ, সমাজে যে মতটায় বেশির ভাগ মানুষহ্যাঁদেয়, সেটা যে সেই সময়ের সবচেয়ে এগিয়ে থাকা চিন্তা নয়, -ব্যাপারে সন্দেহ থাকতে পারে না
পাঁচ
সি পি আই-এর ছাত্র সংগঠন এআইএসএফ নেতা কানহাইয়া কুমার। সাম্যবাদী তত্বে নিপীড়িত জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। লেনিনবাদে রয়েছে এই তত্বায়ন। সেখানে এও উচ্চারিত যে, কমিউনিস্ট পার্টি সেই লড়াইতে অপ্রেসড ন্যাশানালিটি- হয়ে অংশ নেবে। তার সঙ্গে যোগ করুন নয়া-উপনিবেশ তত্ব আর সাব-অল্টার্ন দৃষ্টিভঙ্গি --- পেয়ে যাবেন বেগুসরাইয়ের বিহাট গ্রামের ছেলেটাকে। যে হয়তো বিশ্বাস করে, কাশ্মীরের জনতা ভারত সরকারের হাতে শোষিত হচ্ছে, তাদের ন্যায্য স্বাধীনতার দাবীর সমর্থক কেউ না, না ভারত, না পাকিস্তান
কিন্তু তাহলে কানহাইয়া কুমারকে জেলে পোরার আগে ভারতের সব সাম্যবাদী দলগুলোকেই তো নিষিদ্ধ করতে হয়!
ভাবুন, সুবাস ঘিসিং-এর নেতৃত্বে যখন দার্জিলিং-এর নেপালি জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রাথমিক দাবী তুলেছিল, তখন তাদের সমর্থন করারই কথা কানহাইয়া কুমারের পার্টির। কিন্তু রাষ্ট্র-সরকার গত শতাব্দীর আশির দশকে মনে তেমন কোনও আশঙ্কা তো রাখেইনি, উলটে আত্মবিশ্বাসী ছিল, সংসদীয় গণতন্ত্রে নাম-লেখানো রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা সাম্যবাদী দলগুলোর জোট-সরকার সেইবিচ্ছিন্নতাবাদীআন্দোলন সুচারু হাতে থামিয়ে দেবে
তবে, আজ জে এন ইউ-এর একমুঠো ছেলেকে ভয় কেন?
জানুয়ারি মাসে দিল্লি গিয়েছিলাম। মোবাইল ফোন হারিয়েছি, একটা পুরনো সিম কার্ড সঙ্গে ছিল, কিন্তু তার নম্বর মুখস্থ নেই। রিচার্জ করাতে দোকানে গিয়ে দোকানদারকে অনুরোধ করছি, ভাই, আপনার মোবাইল নম্বরটা বলুন, একটা রিং করবো, আপনার সেট- আমার নম্বর উঠে যাবে, তারপর রিচার্জ করিয়ে দিন
মহাবীর এনক্লেভ-এর গোটা বাজার ঘুরলাম, কোনও দোকানদার রাজি হয়নি
আমি টেররিস্ট হতেই পারি, আমাকে মোবাইল নম্বর দিয়ে ফেঁসে যাওয়ার বান্দা কেউ নয়। বা, হয়তো আমার সেটটা ট্রিগার করবে একটা বিস্ফোরণকে, কে বলতে পারে!
সেবার দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে সেমিনার শুনতে গিয়ে দেখি, প্রফেসরদের প্যানেল ডিসকাশানে মুসলিম সমাজজীবনে রাষ্ট্রিয় শোষণ নিয়ে ডঃ দুবে বলছেন, পরে স্কলারদের মধ্যে কাশ্মীরের ছাত্র আসিফ লেন পেপার পড়ছেন সে ব্যাপারেই। আর একটি দক্ষিণ ভারতীয় মেয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই গবেষক, নাম সম্ভবত মীনাক্ষী, তার থিসিসের বিষয় কাশ্মীরের দৈনিক কাগজের রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট মালিক সাজাদের লেখা সেই মহাবিতর্কিত গ্রাফিক উপন্যাসমুন্না: বয় ফ্রম কাশ্মীর”, যা ভারতীয় প্রকাশন সংস্থার কাছে প্রত্যাখ্যান পেয়ে আশ্রয় করেছিল হার্পার-কলিন্সকে
তখনই বুঝতে পারি, আমাদের রাজধানীর তরুণ বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশে প্রো-মাইনরিটি মনোভাব দারুন জায়গা করে নিয়েছে। প্রশ্নোত্তর পর্বেসম্ভবত মীনাক্ষীকে কিছু কথা জিগেস করলাম, ডায়াস থেকে নামার পর আলাপ হল আসিফের সঙ্গে। ওরা প্রত্যেকে থিয়োরিস্ট, কিন্তু প্রতিবাদী, সামাজিক ইস্যুগুলোকে মনের মধ্যে নাড়ে-চাড়ে, আদর্শবাদের চোখ দিয়ে দ্যাখে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকে আর তার হাজার ত্রুটি খুঁজে পায়। ওদের অভিজ্ঞতার অভাব আছে, হঠকারী ভাবনাওকিন্তু ছেলেমেয়েরা কেউই দেশটাকে ঘেন্না করে না, চায় না তাকে নষ্ট করতে। এটা সত্যি যে টেররিস্ট গ্রুপগুলো এদের মধ্যে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ খুঁজবে, কিন্তু কেউ ধর্মীয় মৌলবাদীর সঙ্গে দেশের সবচেয়ে মেধাবী, শিক্ষি্ত, সাহসী, চিন্তাশীল জনগোষ্ঠীকে এক দাঁড়িপাল্লায় মাপলে আমি তাকে মহাবীর এনক্লেভের সেই মোবাইল দোকানদারের চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে পারবো না
ছয়
যে গণতন্ত্র যতো বেশিঅবাধ্যতাসহ্য করতে পারে, সে ততো শক্তিশালী
প্রতিষ্ঠানের একটা ফোলানো-ফাঁপানোইগোথাকে। এই অহং ঠিক মুদ্রার মতো যার মুন্ডুতে ক্ষমতার দম্ভ আর লেজে ক্ষমতা হারানোর ভয়। প্রতিভাবানেরা প্রতিবাদী বলে প্রতিষ্ঠানে না ঢুকে স্বাধীনতা বাঁচিয়ে রাখেন, অথবা প্রতিভাবানেরা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়লে ওদের নিয়মকানুন মেনে যথাবিহিত ভোঁতা হয়ে যান দুচারদিনে --- এমনই জানা গেছে
কিন্তু আর-সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাষ্ট্র-সরকারের একটা বড়ো তফাত এই যে, আপনি ইচ্ছে করলে টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু সরকারকে সুইচ অফ করা যায় না। তাছাড়া, অন্য যে কোনও প্রতিষ্ঠানের একটা টার্গেট অডিয়েন্স থাকে; সরকারের আওতায় দেশের সব মানুষ, জীবজন্তু, প্রাকৃতিক সম্পদও
একটা দেশে যে কোনও ইস্যুতে অধিকাংশের মত এক রকমই হয়। গণমাধ্যম তাকে সমর্থন করে, সরকারও তারই পৃষ্ঠপোষক। (যদিও মিডিয়া আর সরকারের স্বার্থ সবসময় এক হয় না, সে আরেক আলোচনা) এই মতগুলো স্থিতাবস্থার পক্ষেই থাকে। যেমন, খুনি বা ধর্ষককে ফাঁসি দাও, অথবা, আমার দেশের সঙ্গে অন্য কারও যুদ্ধ হলে যে অন্য দেশটাকে সমর্থন করছে সে দেশদ্রোহী
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতের সঙ্গে অ্যাকাডেমিয়ার দৃষ্টিভংগির একটা তফাত থেকে যাবেই। দ্বিতীয়টা অনেক বেশি তথ্যসমৃদ্ধ, শিক্ষিত, আধুনিক আর নমনীয় হবে। কাজেই, যে কোনও ইস্যু নিয়ে ভাবার সময়ে তাদের হাতে অপশান থাকবে অনেক বেশি। ভবিষ্যত-সমাজ কেমন হতে চলেছে, তার অনেকটা ইশারা এদের ভাবনায় ধরা থাকে। উল্টোদিকে, প্রতিষ্ঠান পপুলার ম্যানডেট আর ইগো, এই দুই পায়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যে যে কোনও বিরোধাভাসের সামনে তার প্রাথমিক অপশান মাত্র একটা --- না!
খবরের কাগজে পড়লাম, জে এন ইউ-এর দুই ছাত্রনেতা অনির্বান আর উমর ধরা দেওয়ার পর দিল্লি পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সময় যা বলেছে, অফিসারদের মাথায় তার বিন্দুবিসর্গও ঢোকেনি। এখানেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষিত হয়ে ওঠার দরকারটা এসে পড়ে। শিক্ষা থাকলে তাত্ত্বিক লড়াইয়ের আখড়া হয়ে উঠতে পারত জেএনইউ বা যাদবপুর ক্যাম্পাস; ধরপাকড়, উকিলি মারধর, হাইকোর্ট, দেশদ্রোহিতা --- বেকার বসে থাকত। তা না হয়ে স্থূল আর সূক্ষ্মকোনে ভাগ হয়ে গেছে পৃথিবী --- পপ মিডিয়া বনাম অ্যাকাডেমিয়া; সাব-অল্টার্ন ভার্সাস স্মৃতি ইরানি
কানহাইয়া কুমার তো ধ্রুপদী মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের বাইরে একটা শব্দও বলেনি। বলা তার কাজ। কর্মবীর হতে গেলে কানহাইয়ার পার্টিই পেছন থেকে শার্টের হাতা টেনে ধরবে। বরং ওর এই কথাটা বেশ ভালো লাগল --- ভবিষ্যতে নেতা নয়, অধ্যাপক হতে চাই। এখন সমাজ-পরিসরে ওই অ্যাকাডেমিক জগতেই একমাত্র কিছু নতুন ভাবনাচিন্তার জায়গা খোলা আছে
জুডিথ বাটলার আর গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক-এর একটা বই পাওয়া যায়: ‘হু সিংগস দা নেশন-স্টেট?’ যেখানে বাটলার, যে-শক্তি জোর করে রাষ্ট্রের সঙ্গে জাতিকে জুড়ে দেয়, তার বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। বলেছেন, জাতি-রাষ্ট্রের ধারণারাষ্ট্রহীন মানুষনামের বিভাগ তৈরি করে, টেনে এনেছেন হানা আরেন্ড-কথিতজাতীয় সংখ্যালঘুটার্মটাকে

কিন্তু ছোট্টোখাট্টো কানহাইয়া কুমারকে আকাশের দিকে সৌন্দর্যময় তর্জনী তুলেআজাদি’- শ্লোগান দিতে শুনে মনে পড়ছিল একটা লাইনই যা অন্য প্রসঙ্গে এই বইতেই বলেছেন জুডিথ, “পাওয়ার ইজ নট দা সেইম অ্যাজ

No comments:

Post a Comment