Monday, 18 August 2014

এ-তরী তোরই....

এ-তরী তোরই....

একঃ
মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়।
তার আগের একযুগ বছর, মা যখন শয্যা-ধরা, ঘরানার অনুবর্তন মেনে আলাপ শুরু হয়েছিল.......দিনেরাতে কয়েকটা পাতলা টোকার আওচার। 
আমার মা তীব্র মধ্যম! এমন কড়ি মা --- রোদের সরোদে ঘাট-কাটা না-ই থাকুক, একটা সপাটে অতি-তারের ষড়জ ছুঁয়ে দিতো।
মায়ের বিনাশের পর আমার মায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব, যেহেতু আমি মরহুম হিসেবে তার কয়েক বছরের সিনিয়ার। আর বেঁচে থাকতেই জেনে গিয়েছিলাম, আমার টেঁসে যাওয়ার জন্যে কেউ (তুমি) দায়ি হতে পারে (পারো) না।

চোখ বন্ধ করে শৈশব ভাবি.....ছাই রঙের অলংকৃত বন্ধ ঘর একটা। ঢোকার আগে, পরে, এমনকি প্রবেশকালেও তাকে দরজা-ভেজানো দেখতে পাই। সেখানে বসে থাকতে থাকতে আপন-ঘনিষ্ঠ....এবার নিজের হাড়ের কুচকাওয়াজ শুনি, নিজের মাংসপেশীর লম্বা শ্বাস লেখার-টেবিলে মাথা রাখে।

যে-অস্তিত্ব আমরা নিয়ে জন্মেছিলাম, তা জন্মমাত্র চুরি গেছে; যাকে অর্জন করেছি --- হারিয়ে ফেলেছি নিজেরাই; তারপর চাপিয়ে দেওয়া সত্তা নিয়ে গোঙাচ্ছি বাকি আয়ুকাল। আরোপিত জীবনের আরেক নাম তো অবসাদ। যে-চরিত্র নিয়ে এসেছিলাম, সে কবিতা। যাকে আয়ত্ব করেছি, তাহা “সুস্থ থাকার ন’টি উপায়”। কাজেই যত প্রথম জীবনের কাছে যেতে চাই, তত দ্বিতীয় জিন্দগী ভুলি আর হাতে পাই তৃতীয় বেঁচে থাকা।

অথবা এমনও বলা যায় যে, আমাদের মর-অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সময় কখনও শেষ হবে না, মহাশূন্যের কিনারা নেই...তবু আয়ু সীমানা-মাপা। যখন কিশোর কাঠি-আইসক্রিম বা তরুণ কেমিস্ট্রি-বই আর ফেরত পেলামই না, তখন জীবন একটা স্বপ্নমাত্র। কোনওদিন কি ফিরে আসবে আমার গৌরবর্ণ পণ্ডিতমশাই বাবাটি বা রান্নাঘরে নিচুগলায় কচুশাক কুটতে থাকা দিদিমা? অস্তিত্ব এক ছাপানো আইডেন্টিটি কার্ড। তার সব সুখ মিথ্যে, যেমন রসগোল্লা পেটের মধ্যে চলে গেলেই তৎক্ষণাৎ তাকে মুখে পোরার বাস্তবটা মুছে যায়। শুধু আঘাতগুলোকে আপনি কোনও পরমাণু-বোমায় ঊড়িয়ে দিতে পারছেন না। চিউয়িংগাম-কষ্ট = শেষহীন বেঁচে থাকা (সমীকরণ ১)। এই অনুপাত দ্বিতীয় সমীকরণে বসিয়ে পাই, চোট বাধাহীন হলে তবেই প্রাণ চিরঞ্জীবী!

অনেকদিন ধরে আমার মন বলছে, ক্ষত-বিক্ষতর দুই সন্তানঃ অপদার্থ বড়টির নাম অবসাদ। মেয়ে দেখতে ভালো (কিন্তু, ভেতরে ভেতরে বদমাশ)....কবিতা।
দেখা হওয়ার আগে বা পরে, সামনে ও পেছনে থাকে দেখা না হওয়া। কাজেই যে কোনও সময়ের প্রস্থচ্ছেদ হাতে নিলে বোঝা যাবে, ছাড়াছাড়ি মিলমিশকে পরিষ্কার ২-১-এ হারিয়ে বসে আছে।

শূন্য এক ভারতীয়ের আবিষ্কার। বিচ্ছেদও কি তাই! 

দুইঃ
একদা পুব পাকিস্তান থেকে আমার বাবা-মা-দাদু-দিদিমার একটা মণ্ড হিলহিলে পেছল পানাপুকুরে তিনদিন গা ডুবিয়ে...কেউ ছ’মাসের পোয়াতি তো কেউ বাঁহাতের চারটে আঙুল নজরানা দিয়ে এসেছে সম্প্রীতিকে...বর্ডার পার হতে পেরেছ তো নাও, কলোনিতে পাঁচ কাঠা জমির উপঢৌকন ও ডোল একশত টাকা। মুলিবাঁশের বেড়ায়, টিনের চালে, মাটির ডোয়ায় ঘর তোলো। আমগাছ ও বৃষ্টিবাদল তোমার, আয়পয় ও স্মৃতিকষ্ট তোমার।

তাই মনকে খারাপ করার শক্তি আমার জন্মবেলা থেকে। রাস্তার ছোট ছোট ইঁটের টুকরোয় লাথি মারতে মারতে স্কুল যাওয়ার সময় মন খারাপ বাড়ির জন্যে, আবার বাড়ি ফেরার ওই রাস্তাতেই হাতের কঞ্চিবেতে কচুগাছের মুন্ডু এলিয়ে দেওয়ার সময় বুকে মোচড় স্কুলের লাগিয়া। পরীক্ষা এগিয়ে আসা, পুজো চলে যাওয়া, ছুটিতে দিদি-জামাইবাবুর কাছে বেড়াতে না যেতে পারা, বাবা দুর্গাষ্টমীর দিন মাংস কিনে না আনা, হরিলুঠে বেশি বাতাসার দখল না পাওয়া, নিজের দোষে রান আউট....পেট্রাপোল সীমান্তে সারসার ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে।

আরও কিছুটা বিষাদ পেতাম রেশনে মাইলো-কেরোসিন তেলের সঙ্গে মিশিয়ে। কেননা, আমাদের প্রতিপালন করত রিটায়ার্ড বাবা নয়, টাকা পাঠিয়ে টায়ার্ড সেজদা-সোনাদাও নয়, দোকানদার। এ-দেশিয় বিরাট খাম্বাওলা উঁচু দালানের বাইরে দাঁড়াতাম অন্ধ ভিখিরি, অফুরন্ত ডিঙ্গি পেড়েও জানলা-সমান করতে পারতাম না দুচোখ (কোনওদিনই পারবো না সে যতই লম্বা তুমি বলো আমাকে), আধো-অন্ধকার ঘরে স্লিপের পাতা আর কাঠের সিন্দুক নিয়ে বসে থাকা রোগা বসন্তদাগ কর্মচারির মুখ দেখতে পাবো না, কেন সে বিরক্ত-চোয়ালে, তাচ্ছিল্য-চোখে ঢালাও কেটে দিচ্ছে আমাদের চাল-গম-চিনির বরাদ্দ !

তার বেশ কিছু বছর পরে গানটা বেরলো, “হম খেলেঁ তুফানোঁ সে, ইস দিলকি অরমানোঁ সে....”। তখন বড় হচ্ছি, রীনা রায়কে পড়ার মতো বড়। নদীয়ায় নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর বাড়ির বকুল গাছটির মতো কী ব্যাঁকাচোরা সেই বৃদ্ধি...দাদার মারের হাত থেকে ছুটে বেরিয়ে দৌড় আর থামাতে পারছি না, মা যে ডেকে নেবে তার উপায় নেই, আগেই বলেছি, গর্ভধারিণীর সঙ্গে আলাপই করাতে ভুলে গেছে সবাই তালেগোলে!

তার অনেকদিন পরে তোমাকে বলেছিলাম এই কলোনি-জীবন, যাকে কখনও খুব একটা নিম্নাঙ্গ-সংগীত বলে মনে হয়নি আমার, এই জন্যেই কী যে, রেডিওতে শোনা যেত হাইকোর্ট প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন অ্যালান কনোলি, সম্মান জানিয়ে ভাষ্যকার উচ্চারণ করতেন একটু উদাত্তভাবে অ্যালান কনঔলি আর আমাদের বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া টুটা-ফুটা নিবাধুই কলোনিকে মনে হত ওই অস্ট্রেলিয় ফাস্ট বোলারের আদরের ছোটোভাই?

আর তোমার স্মৃতিশক্তিকেও প্রশংসা করতে হবে, যখন পলকা কাঠের ব্রিজের ওপর ট্রাক চাপিয়ে দেওয়াতে মড়মড় করছে আমাদের সম্পর্ক, টেলিফোনে খুব শান্ত ও দায়িত্বশীল গলায় বলেছিলে, “বেজন্মা,কলোনির মাল!” ওমনি এতক্ষণ অন্যমনস্ক রীনা রায়... দুধসাদা চুড়িদার, ফাঁকা পায়ে হেঁটে এসে শূন্য স্টেজে দাঁড়ালেন...” মাঝি ছোড় যাতা হ্যায়, সাহিল ছুট যাতি হ্যায়”...গাইতে গাইতে বিষণ্ণ চোখ উঠল ক্যামেরার দিকে, নিটোল ডান হাত মুজরা গায়িকার অস্ফুট ভঙ্গিতে মাথার ওপর যেই উঠেছে, ফ্রিজ হল সিনেমার পর্দা। 

তাহলে কবিই বানিয়ে দিলে তুমি আমাকে!
তিন
মানুষের নামের সঙ্গে তার স্বভাবের কোনও ওঠা-বসা নেই ভাগ্যিস, নয়তো কত ঘনঘন নামের জার্সি বদলাতে হতো, ভাবো।
অথবা এমনও হতে পারত --- একগুচ্ছ হাজব্যান্ডের নাম শীতলতা, এক-স্তবক স্ত্রী হল মনোমালিন্য (উলটোটাও ধরা যায়), কিন্তু সবার সন্তানই অনুশাসন।

ছাদের ঘরে উঠে পুরনো সিলিং-ফ্যান চালিয়ে দিলে আগে বেশ বানান করে ঘুরত --- ক্রান্তি। এখন দেখি সেও....ক্লান্তি...ক্লান্তি....ক্লান্তি.....নাম পালটেছে।

কলেজবেলা থেকেই অন্যের হেলমেটে মাথা গুঁজে লড়াই চালাতাম। কোনও শিরস্ত্রাণের নাম থিয়োডর অ্যাডরনো, কোনওটা হারবার্ট মার্কুস...এভাবে জেমস জয়েস বা অরুন্ধতী রায়, চার্লস ডিকেন্স অথবা লিওটার নামের প্রকাণ্ড মেঘসকলের আড়াল থেকে বন্ধুদের দিকে তীর ছুঁড়েছি তখন থেকে মেঘনাদ।

টেবিলে উপুড় পড়ে থাকতে থাকতে পেট-ফুসফুস গুলিয়ে ওঠে। কাল রাতে কী খেলাম মনে করার চেষ্টা করি...কাটজিয়ার “এলিজাবেথ কস্টেলো” থেকে কিছু পৃষ্ঠা হয়তো, যেখানে সিমপ্যাথির ওপর মোহনভোগ ভাষণ আর কগিটো আরগো সুম–এর হালকা কাঁচালংকা-ঝাল আলোচনা। একটা ক্যাপসুল রগের ভেতর দিয়ে গিলে নেবো কিনা ভাবা যাক.....সিসের খাপে মোড়া জীবনদায়ী অ্যান্টিবায়োটিক।

শুধু তোমার ওপর এই একটুফোঁটা অভিমান থেকে গেল যে, আমার পুরনো নামের ট্যাগ কান থেকে খুলে কবি-লেখা একটা কাগজ কপালে সাঁটিয়ে দিয়েছ, যেমন বিমান-বন্দরে বা মর্গে বা লোকসভায় দেওয়ার নিয়ম। অথচ এমন একটা কথাও তো জানি না যা পৃথিবীর অজানিত! স্কুলে কেউ কবিতা লিখলে বাকি সবাই “কপি কপি কপি”...বিনা আদরে তুমি সেই বাঁদরই বানালে আমায়। অথবা, খাসি বলাই কি ঠিক হবে? যে অণ্ডকোষ নেই, তাকে চেপে ধরে মুঠো থেকে টুপিয়ে পড়া অলংকার রাস্তায় ছুঁড়তে ছুঁড়তে আমি ছুটে যাচ্ছি আর পৃথিবীর সব বাঙালি মেয়ে বিরক্তিযোগে সরে দাঁড়ায়, সদ্য সাইকেল-শেখা ছেলে দেখলে বুড়ো মানুষ যেমন যুক্তিপূর্ণ অনিশ্চিতে মাঠের ভেতর নেমে যেতে থাকে।

যে-লোকটা খুব সম্ভব চিলিচিকেন-বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিল, বা বিগত সরকারের আমলে তাসের লাস্ট ডিলে পার্টনার থ্রি ডাইস-এ সাপোর্ট দেয়নি বলে ব্লক পর্যায়ের মিটিংয়ে বিষয়টা তুলতে আগ্রহী, পাশের বাড়ির বৌদির সঙ্গে দোলের দিন পাঁচটা মিনিট চেয়েছিল একান্ত আপন, তাকে তুমি কবি বানালে কেন গো সোনা, জানতে হলে ক্লিক করুন এখানে......

বাড়ির নিঃঝুম গেট দিয়ে মেরা-কুছ-সামান সহ অফিস-ফেরত ঢুকছি, নিজের পায়ের নিচে নিজেই চাপা পড়ার মতো একটা শামুক “খ্যাঁচ” হয়ে গেল। সে তো নিম্নবর্গের অমেরুদণ্ডী, খুলি নেই, তাই ব্রেন ছোট...কে জানে, মস্তিষ্কই নেই!
কোনও কোনও মানুষও ভেঙ্গে গেলে এমন ধারালো হয়ে ওঠে কিনা, আই ডিফার টু বেগ (প্রেম) থেকে আই বেগ টু ডিফার (কবিতা)-এ চলে যায় কিনা জানতে হলে ক্লিক....

প্রেম এক ফুলবডি পাঞ্জাব লরি। ট্রাপিজের দড়ি দিয়ে বাঁধা তোমার প্রিয় অ্যাশ কালারের ত্রিপলের গায়ে রোহতকের শিশির, ঝুমরিতলাইয়ার ঠুমরির সুর, কোয়াট্টম-এর নারকোলফুল বা বারিপদার বেনেবউ পাখির পালক। তারপর সেই যান কলকাতায় বন্ধ লেভেল-ক্রশিংয়ের সামনে পা ঠুকছে, ঘর্ঘর ইঞ্জিনের তাড়সে থিরথির করছে স্টিয়ারিংয়ে রাখা ড্রাইভারের কবজি, কেননা, তার লক্ষ্য গুদামঘর --- পিঠে চাপানো এত করুণা, দাবী, আঘাত, সংশয় সে আনলোড কোথায় করবে! শুধু দুপায়ের নিচে রুলটানা তিরিশ লেনের জাতীয় সড়ক পড়ে থাকে। নিজের বিষাদস্বপ্নঅতৃপ্তমাখোঁজা প্যাকেটগুলো সে মজবুরন ডেলিভারি দিক ওই পেনের ধুলোয়.....।

চার
প্রেমকে যদি পশমে মুড়ে কোনও বরফমাখা পাহাড়ে তুলে আনা যেত, ঠিক আছে --- নেপালি কিশোরের অন্ধকার পা-পেছলানো জিপে চড়িয়েই, তারপর প্রেমের বেড়ালশিশু-চোখদুটো টেনে ফুটিয়ে বলতাম, দ্যাখো গুঁড়োমশলা আবিষ্কারের আগে এটাই ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সানরাইজ, যদি প্রেমকে হিমায়িত করে রাখা যেত কুয়াশাময় বৌদ্ধ মনাস্ট্রিতে উঠে যাওয়ার রাস্তায়, তবে এভাবে পচে উঠত না আমাদের সম্পর্ক! 

সে আমার খুব থুরথুরে-বয়েসি আত্মীয়, আর ফেরত পাবো না জেনেও হসপিটালে নিয়ে এসেছি। সাদা নার্স তাকে সাদা স্ট্রেচারে শুইয়ে সাদা দেওয়ালে পাশ দিয়ে সাদা দরজার ওপিঠে চলে যাবে। আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্ট্রেচারের ঠাণ্ডা হাতল ধরে থেকে ছেড়ে দেওয়ার সময় একটা ছোট্ট ঠেলা দিই.....যাও, ভেসে যাও প্রেম, তোমাতে গতিসঞ্চার হোক। বিজ্ঞানের নরম কাচ ভেদ করে, সভ্যতার অ্যানাসথেসিয়া জয় করে যদি বেরিয়ে যেতে পারো ওদিকের শূন্যতায়, মাছের কাঁটার মতো দেহে কোনও কসমিক বেড়াল মুখ দেওয়ার আগেই যদি ব্যক্তিগত আহ্নিকগতি ও অয়নকাল আবিষ্কার করতে পারো, তবে নীল গোলাকার স্মৃতির চারদিকে সেই আবর্তনপথ তোমাকে চাঁদের অমরত্ব এনে দেবে।

আই-ইউ মিশে গেলে আয়ু হয়, এই ছিল আমার শেষাতিরিক্ত বিশ্বাস। না হলে কীভাবে ভুলবো বন্ধুর ক্যান্সারে মৃত্যু আসলে আমারই অর্ধেক মরে যাওয়া, প্রতিবেশির আত্মহত্যা অনেক দূর পর্যন্ত আমারই ট্রেনের নিচে ঝাঁপ, অথবা সহকর্মীর প্রতি তার সন্তান নিষ্ঠুর হলে আমি কিছু ওই বৃদ্ধ মহিলা, কিছুটা তার মদ্যপ ছোট ছেলে।

যে চলে গেছে, তার ছায়া খুঁজে বেড়িয়েছি অন্য কারও “মধ্যে”, আর ছাপার ভুলে টানাটানির “মদ্যে” শুধু তার তলানি ফুটে উঠেছে। ধারাবাহিক উপন্যাসের মতো এক কিস্তিমাত যন্ত্রনা শরীর, প্রতিদিনের জীবন, স্মৃতি আর ভাষাশক্তি ধুঁধলা করে বসে থাকে। তবু এটা তো ঠিক যে, কোনও না কোনও কাজ নিষ্পন্ন করতেই এসেছি আমরা সম্পর্কের কাছে। যেদিক থেকে প্রথমে মেটে, হাততালির গিফট ভাউচার সেদিকেই এগিয়ে যাক। 
পরীক্ষা-হলে আগে উত্তর লিখে খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে গেলে আমরা তাকে মেধাবী বলি কি না! 
পাঁচ

জীবনের তো কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। সে নিজেই সাইড এফেক্ট --- মৃত্যুর। যেমন প্রেমের রিঅ্যাকশান গায়ে লাল গোটা-গোটা অবসাদ, আর কবিতা লিখতে হয় বলে সব সময় ফুলহাতা শার্ট পরে থাকি --- অতিসুস্থতা কনুইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখার জিনিস। ট্রেনে-বাসে কারও সঙ্গে কথা না ব’লে বইমুখে....কারণ ঐ, মেয়েদের সঙ্গে অর্জিনাল চন্দনের বদলে সুশীলসমাজ ব্যবহার...কারণ ঐ, যাতে সবাই বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে বের না করে দেয় চাকরির খাপ থেকে, হারমোনিয়ামের সি-ন্যাচারাল থেকে, জীবনের শোক-প্রস্তাব থেকে এবং তারপর দিদিমার ভাষায় আমি “কেরমে কেরমে” রাস্তায় নেমে যাব। যে-উন্মাদ রেলস্টেশনে বসে আছে, একটু আগে কোলে দুটাকা ফেলে এলাম, মাথায় জটপড়া গাঁজানো চুলে উকুনে উকুন (টাকমাথা পাগল কেন আজ পর্যন্ত জন্মালো না!) --- ভালোই জানি, একই তড়িত-পরিবাহী দ্রবণে গুলে আছি আমি আর সে। আর মাত্র কয়েকটা দিন.....আমার হাইড্রোজেন পরমাণু খুলে গিয়ে লাগবে পাগলের মূলক-এর সঙ্গে......এই প্রতিস্থাপন বিক্রিয়াটির শেষে দেখতে পাই, আমি ঠিক ওই একই পোজ-এ দু’পা সামনে ছড়ানো --- চাপচাপ ময়লা বুকে-পিঠে, পায়ে অ্যাঙ্কলেট পরার জায়গায় একটা মাছি-ওড়া ন্যাকড়া --- বিড়ির টুকরো আর ধুলোর কোষপ্রাচীরে বাঁধা গোল থুতুর মাঝখানে বসে আছি; ফাটা প্যান্টের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে অণ্ডকোষ যা বহুদিন আগেই কর্তিত।

তারপর স্বপ্নে-পাওয়া স্বপ্ন ফলো ক’রে লম্বা কালো নাকের ভেতর লাল পিঁপড়ের জন্ম, জলের গ্লাস থেকে গলার ভেতর অসাবধানে ঢুকে প’ড়ে দুই ফুসফুসের মধ্যে দুটো টিকটিকির লাফ; ছেঁড়া রাবারের চটি, পুরনো খবরের কাগজ, খালি ওষুধের পাতা দিয়ে বাঁধা-ছাঁদা আমার পুঁটলির নিচে লুকনো মাইক্রোফোন, না হলে তোমরা শুনছো কী করে অহীন্দ্রকালের নাটকের পুনরাভিনয়.....!

শেষ শটের ওপর ড্রপসিন ফেলতে গিয়ে আমার প্রথম দৃশ্যটা মনে পড়বেই। আহা, গান ছিল ওই এপ্রিল-মুঠোয়!

সে আমার ভোরের আকাশে হাওয়া-মিঠাইয়ের মতো মেঘ
সে আমার মনের শেকড়ে তিস্তার গতিবেগ
সে আমার বেকহ্যামের মাপা পাসে খুলে যাওয়া জীবন-দরোজা
তার জন্যে অপমান.....বন্ধুর বিদ্রূপ সওয়া সোজা, খুব সোজা

আপনার লেখা? জিগেস করল “সে”। তার আগে হাতদুটো কোলের ওপর রেখে মুখনিচু বসে রইল প্রায় তিন মিনিট (পরে এডিট হবে)। একমাথা খোলা ভিজে চুল দেখাবে বলেই হয়তো আজ দুপুরে ডেকেছে আমায়....
আপনারই সুর? ব’লে মকরমুখী সোনার বালা থেকে চোখ তুলেছে এবার। বলো তো, কোথায় রাখবে! রাখা হল আমার বাদামি পাঞ্জাবির ডান কাঁধের ওপর।
আরও অপেক্ষা চাইছিলাম। যখন দেখি, বিনা প্রশ্নে সে বিশ্বাস করেছে তারই জন্যে গানখানি এবং যেহেতু গোটা দৃশ্যটাও এই প্রত্যয়ে সম্পূর্ণ একমত, অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে সে কতটা অন্তরঙ্গ, বুঝতে আমার বাকি থাকে না।

মনে হল, চেতনার গা থেকে বাদামের লালচে খোসার পর্দা উঠে যাচ্ছে এবার।
মনে হল, জীবনের শেষে নয়, ভেতরে আছে মৃত্যু, সমান-সমান জল আর অ্যালকোহলের মিশ্রণে এক অলীক অলিভ তেলের ফোঁটা, একই ঘনত্ব....দুলে দুলে বেড়াচ্ছে আয়ুময়; এবার তাকে কোথায় বসতে দেবে, তোমার ব্যাপার!

কেননা, ঈশ্বরের চেয়ে মানুষের গড় আয়ু বেশি, এবং নিজের মডেলে আমাদের বানিয়েছিলেন ব’লে ঈশ্বরের ডেথ সার্টিফিকেটে সই হওয়ার পর (তাঁর মহান আত্মা শান্তি পাক) মানুষও অনস্তিত্ব। কিন্তু মানুষের তৈরি মানব-সমাজ থেকে যায়, শুকনো খাতে নদী অর্থাৎ জল-সমাজ ব’য়ে যাওয়ার মতো। এই কথাবাক্য যেতে যেতে শেষ সত্যি বলল ---- প্রেম নেই। কিন্তু প্রেমিক রয়েছে।
যেদিন মেঘের ধস আকাশে, বাতাসে মিশ্রণ হয় সন্ধে-কণার, বুনো ঘাসের পিঠে সমবেত বৃষ্টিবেত নামে, আমি হেঁটে হেঁটে দূরের মাঠের মাঝখানে যাই। মুখ তুললে শূন্যতা-স্নাত শূন্যতা। জিগ্যেস করিঃ বলো, আমরা কি পৃথিবীতেই এসেছিলাম, না একে অন্যের কাছে?  

সাক্ষাৎকারঃ বিনয় মজুমদার

সাক্ষাৎকারঃ বিনয় মজুমদার (জানুয়ারি, ১৯৯৪-এ “ঋতীয়া” পত্রিকায় ছাপা)

[১৯৯৩-র শীতে নেওয়া এই সাক্ষাৎকার। বিনয় সে-বছর কালীপুজোর ঠিক পরপর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসিত হয়ে ফেরেন শিমূলপুর, ঠাকুরনগরের বাড়িতে, কিন্তু অবস্থার খুব সামান্যই উন্নতি লক্ষ করা গিয়েছিল। দুবেলা খাবারের বন্দোবস্তো করা, ওষুধ খাওয়ানো বা স্নান করতে বলার লোক নেই। ফাঁকা বাড়িতে আবার বিনয় একা.....] 

“লিখে দিও এসব কথা বিনয় মজুমদার বললেন....”

---- তোমার নাম কী (চন্দন), কোথায় থাকো (দত্তপুকুরে), না তুমি কলকাতার সূর্য সেনের রাস্তায় একটা ছাপাখানাতে...আমার বই ছেপেছিলে মনে আছে (না, আমি চন্দন ভট্টাচার্য, দত্তপুকুর...) চুপ চুপ, চোখ বন্ধ করো, ঠোঁট বন্ধ, এবার ভাবো মোম লাগানো একটা কাপড়ে আলকাতরার কালি ফেলে ফেলে তুমি বই ছাপাও, এই ঘর, টেবিল, তক্তপোষ সব ভুলে যাও....মনে পড়ছে? (হুঁ) হ্যাঁ কিনা বলো (হ্যাঁ হ্যাঁ) বেশ, আবার তুমি চন্দন ওঝা ঠাকুরনগরে থাকো, থাকো কিনা? চোখ বন্ধ, ঠোঁট বন্ধ (হ্যাঁ, থাকি) আমার বাড়ির পাশে....কবিতা লেখো? (লিখি) একজন কবি চন্দন ওঝা, বিবাহিত, বাচ্চা আছে, তুমি বিয়ে করেছো? হ্যাঁ কিনা (হ্যাঁ), সন্তান আছে? (একটি) আবার তুমি থাকো দত্তপুকুরে....তুমিই তো কবিসেনা, কবিদের যুদ্ধ করতে বলেছিলে (না, আমি....) আঃ চুপ করো চোখ খুলছো কেন, কথা বলবে না, তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে দাঁড়িয়ে একদিন বক্তৃতা দিয়েছিলে....সেই দেবদারু গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বললে কবিদের শুধু কবি বলেই ডাকতে হবে, অন্য নাম নেই....বলেছিলে কিনা?

[যতোবার গিয়েছি, সন্ধের মুখেই তাকে ঘরে সহজে পাওয়া যায়; ময়লা গায়ে আর জামা-কাপড়ে, হাতপায়ের বড়ো নখে, সামান্য তক্তোপোষে জুতোসুদ্ধু বসে আছেন, পায়ের ওপর পা, ডানপায়ের পাতা অস্বাভাবিক জোরে নড়ছে। ঘরে ঢুকতেই শুকনো-নতুন গুয়ের মিলিত গন্ধ ফুসফুস চেপে ধরে, বিনয়ের স্নায়ু এই পরিবেশে আর কতোদিন জেগে থাকতে পারবে?]

--- তুমি বি এস সি পড়েছো? (হ্যাঁ), বেশ, অক্ষ পড়েছো? এই হলো উল্লম্ব অক্ষ, এই অনুভূমিক (বাতাসে আঙ্গুল দিয়ে এঁকে দেখান)। যদি অনুভূমিক অক্ষ বয়েস, তবে সে বেড়ে যাচ্ছে, শেষ নেই। এই টেবিলের এখানে শেষ আছে (কাঁপা হাতে টেবিলের প্রান্ত ঘষতে থাকেন) তারপর শেষ-ছাড়া বিস্তার (শূন্যে হাত চালিয়ে), তেমনি বয়েস তোমার যদি দশ বছর হয়, তবে তোমার তিরিশ বছর বয়েস হবে, তিরিশ হলে একশো পঞ্চান্ন হবে, তারপর তিন হাজার পাঁচ হয়ে যাবে, দু’লক্ষ তেত্রিশ হাজার বেয়াল্লিশ বছরও এভাবে বয়েস হয়ে যাবে কোনও বাধা নেই। শেষ-ছাড়া বিস্তার হবে যখন একবার জন্ম নিয়েছো পৃথিবীতে আর কোনও বাধা নেই....জন্ম, তারপর আবার জন্ম, আবার জন্ম...।

আমাদের এখানে এক পূজারী ঠাকুর আছেন তিনি বলেছেন তার বয়েস একশো তিরিশ বছর আর আমার চলছে একশো চোদ্দ।
যদি হাতি হাতির জন্ম দেয়, কাঁঠাল-ফল কাঁঠাল গাছের, ধান থেকে ধানের বাচ্চা হয়, তবে বয়েসও বয়েসের জন্ম দেবে।
আপনার শরীর এখন কেমন?
কোনও অসুবিধে নেই(যেন একটু অবাক), বেশ আছি।
আর্থিক বা কোনও সামাজিক অসুবিধে?
টাকাপয়সা নেই, দিয়ে যেতে পারো (বলেন, কিন্তু চোখে অস্বস্তি লেগে থাকে)
হাসপাতালে কেমন কাটছিলো দিনগুলো?
জানো, আমার ডাক্তাররা সব ছিলো বন্দ্যোপাধ্যায়, বলাকা বন্দ্যোপাধ্যায়, মঞ্জুলিকা বন্দ্যোপাধ্যায়(হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটান) উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়....উজ্জ্বল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পড়াতেন সাহিত্য-দর্শন, আচ্ছা বলতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিগত এতো বছরে সাহিত্য দর্শন শিল্পবিচার সম্বন্ধে এতো ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষাদান করে ক’টি সাহিত্যিক তৈরি করতে পেরেছে? (উত্তরের অপেক্ষায় কিছুক্ষণ) একটাও না, কিস্যু না।

(মনে করিয়ে দিতে আবার আগের কথায় ফেরেন)
আমাকে কোথায় দেখেছিলে?(মেডিক্যাল কলেজ) মানসিক হাসপাতালে তো? (হ্যাঁ, মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল)...তো, এই মানসিক হাসপাতালের ডাক্তারদেরও চিকিৎসা হওয়া দরকার। বন্দ্যোপাধ্যায় মানে বন্দী যোগ উপাধ্যায়, ব্যকরণ কৌমুদী দেখে নিও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত...ওই সব বন্দী ডাক্তার, এদেরও মানসিক চিকিৎসার খুব প্রয়োজন....। যেমন যে জেলখানা নির্মাণ করলো সে জেলের মধ্যে কিছু লোকজন ছেড়ে দিয়ে বললো, তোমাদের কেউ হও অপরাধী, কেউ সান্ত্রী, কেউ জেলর...।

[ঘরে একটা জীর্ণ টেবিলে, যা কবি শূন্য থেকে তৈরি করেছেন, কয়েকটা মোমবাতি, দেশলাই, এক থালা জল। প্রথম দিন ঢোকামাত্র আদেশ হল, রাতের খাবার জোগাড়ের (দুটো পাঁউরুটি, এক কাপ চা), সন্ধে হতে নিজেই বললেন, আলো জ্বালানোর কথা, কিন্তু মোম বসানোর জায়গা কিছুতেই পছন্দ করে উঠতে পারছেন না --- “এই বিন্দুতে ঠিক এই বিন্দুতে...”, আর টেবিলের ওপর কাঁপা আঙ্গুল সরে সরে যাচ্ছে]

---সারাদিন কীভাবে কাটে আপনার?
আমি এই ঘরে খাটের ওপর....এক দিবস কতো ঘন্টায়? চব্বিশ। তার অর্ধেক বারো....আমি ধরো তেরো ঘন্টা....না না, চার বাদ দিলে কুড়ি ঘন্টা এই খাটে বসে থাকি নামি না বাইরে পৃথিবী খুব বিপজ্জনক....আমি অবশ্য সব কবিতা পাঠিয়ে দিয়েছি হাওড়া, শিয়ালদা, ডায়মন্ডহারবারে...সত্তর আশি একশো পঁয়ত্রিশটা কবিতা আমাকে গার্ড দিচ্ছে পৃথিবী খুব বিপজ্জনক....আমি বসে থাকি, মাথাটা দেখেছো আমার, সিংহের মতো, সিংহের যেমন কেশর থাকে (এলোমেলো চুলে হাত বোলান), দাড়িগোঁফে ঢাকা, তার ফাঁক দিয়ে সিংহের যেমন দুটো চোখ বের হয়, নাকের ফুটো, ঠোঁট....তুমি ছবি তুলতে পারবে এই ঘরের? (হ্যাঁ, আমার ক্যামেরা আছে), আচ্ছা থাক, ক্যামেরা আর কামরা একই জিনিস....আমার এই কামরায় বসে আছি (বিড়বিড় করতে থাকেন), তুমি বরং আমার একটা ছবি আঁকো, সিংহের মাথার ছবি।

[নিজের অঙ্কন-ক্ষমতার ওপর ভরসা না থাকায় পরে একদিন ক্যামেরা নিয়ে যাই, দেখেই বলে ওঠেন “ফোতো আপ্পারাত”। আরেকদিন নিয়ে যাই এককপি ছবি আর “যোগসূত্রে”র বিনয় মজুমদার সংখ্যা। দেখে এতো আনন্দ পান, ফেরত চাইতে পারি --- হয়তো এই আশঙ্কায় তাড়াতাড়ি বিদেয় করে দেন আমাদের।]

---সুনীল, শক্তি.... এরা তো আপনার বন্ধু ছিলেন।
সুনীল নামে একজনই আছে, সুনীল গাভাসকার।
আমি বলছি গঙ্গোপাধ্যায় সুনীলের কথা। যোগাযোগ হয়?
সুনীল? বহু চিঠি দিয়েছে আমাকে। এইখানে (হাত দিয়ে খাটের ওপরটা চাপড়ান)।
সে কবে? এখন দেন কী?
সুনীল এখন....ইউ এন ই এস সি ও তার কবিতা ছাপায় ইউনাইটেড নেশনস এডুকেশান....(পুরোটা বলেন, সুনীলের কবিতা ইউনেস্কো....
আর শক্তি চট্টোপাধ্যায়?
চট্টোপাধ্যায় নয়, চক্রবর্তী, দ্বিচক্রযানে করে যে চিঠি বিলি করে বেড়ায়...হেমন্তের অরণ্যে...মানে, পোস্টম্যান....পোস্টমর্টেম....
ঘরে আমার নিজের লেখা কোনও কবিতার বই-ই দেখি না। কেন?
(পাঠকদের জানাই, কবির ঘরে একটুকরো কাগজও দেখিনি দীর্ঘদিন)
শোনো, কবিতা হচ্ছে আমার দেবী। কী? দেবী। তা দেবী আমার কাছে থাকতে চান না। কীভাবে যে উধাও হয়ে যান....!
আপনি দেবীকে দেখেছেন?
তুমি দেখেছো? (খুব বিরক্ত)
নাহ।
(আমাদের মুখোমুখি বসে নিজের পিঠে ডানহাতের তালু রাখেন)
আমার এই হাতটা দেখতে পাচ্ছো?
না
এই হাতটা যেদিন দেখতে পাবে....উদর মাংস হাড় ভেদ করে....সেদিন দেবীকেও....

[বিনয় মজুমদারকে আর কথা বলানো গেল না। দু-একবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে “কী করে যে উধাও হয়ে যায়....প্রতিভাস প্রকাশিত কাব্যসমগ্র আটখানা এনেছিলাম....হাতে হাতে সবাইকে....দেবীকে অন্যের কাছে গচ্ছিত রেখেছি....” বলতে বলতে হঠাৎ গেয়ে ওঠেন আনন্দ-কান্না মেশানো সে এক আশ্চর্য আর্তনাদ; উদাত্ত গলা ভাঙ্গা ভাঙ্গা সুরের কাঠামোর ওপর টলতে থাকে]

আজি মধু সমীরণে
নিশীথে কুসুমবনে
তারে কি পড়েছে মনে
বকুলতলে?

বিদায় করেছো যারে নয়নজলে
এখন ফিরাবে তারে কীসের ছলে গো...

বিনয় মজুমদারের সাক্ষাৎকার

বিনয় মজুমদারের সাক্ষাৎকার
“আমারই তো মুখ প্রতিবিম্বিত” 
(“গ্রন্থি” সাহিত্যপত্রিকার মে, ২০০৫ সংখ্যায় ছাপা)

গ্রন্থিঃ “ফিরে এসো চাকা” ও “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা” কবিতাবইদুটি বাংলা কবিতার আকাশভূমিতে দুই স্থায়ি সংযোজন। এই কাব্যগ্রন্থদ্বয়ে কী কী অন্যরকম বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার ফলে এমনটা সম্ভব হলো?

বিনয়ঃ আপনারে বড়ো বলে বড়ো সেই নয়
লোকে যারে বড়ো বলে বড়ো সেই হয়
নিজের গুণের কথা নিজের মুখে কী বলবো? লোকে বিচার করবে কেন বইদুটো স্থায়ি হলো।

গ্রন্থিঃ তাহলে জিগ্যেস করি, পরের কবিতার বইগুলি প্রথমদুটির মতো পাঠকপ্রীতি বা সমালোচকের প্রশংসা অর্জন করতে ব্যর্থ হলো কেন?

বিনয়ঃ “ফিরে এসো চাকা”তে একটা কেন্দ্রিয় বিষয় ছিলো। একজন মহিলাকে উদ্দেশ্য করে কবিতাগুলি লেখা। তেমনি “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা”র মূল বিষয় ছিলো অঘ্রাণ মাস, মানে হেমন্ত ঋতু। কবিতাগুলি পড়লে যেন পাঠকের মনে একটা হেমন্তের অনুভব জাগে, এই ছিলো উদ্দেশ্য --- সে চৈত্র মাসে পড়লেও যেন জাগে, কি বৈশাখ মাসেও। তা সে কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি আছে লন্ডনে।

গ্রন্থিঃ “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা”র পাণ্ডুলিপি লন্ডনে রয়েছে! কীভাবে ঘটলো ঘটনাটা?

বিনয়ঃ তখন তো আমার কবিতার বই কেউ ছাপাতে চাইতো না। তো, কয়েকজন প্রকাশকের কাছে ঘুরে-টুরে শেষে গেলাম বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে। তাদের বললাম, ম্যানাসক্রিপ্টখানা রেখে দিন। বললো, না রাখবো না। তারপর গেলাম ওয়েস্ট বেঙ্গল আর্কাইভে, ভবানী দত্ত লেনে। চেনো তো ভবানী দত্ত লেন? কলেজ স্কোয়্যারের কাছাকাছি। তারাও বললো --- না। তখন আমার এই বত্রিশ বছর বয়েস। পাণ্ডুলিপিটি নিরুপায় হয়ে লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে দিলাম পাঠিয়ে। এই ঘটনার পঁচিশ বছর পরে একটা চিঠি লিখে জানতে চেয়েছিলাম পাণ্ডুলিপির খবর। তাতে ওরা উত্তর দিলো, আপনার বইটি আমরা যত্ন করে সংরক্ষণ করেছি। এবং “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা”ই আমাদের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে রক্ষিত আধুনিক বাংলা কবিতার একমাত্র ম্যানাসক্রিপ্ট।

গ্রন্থিঃ বাহ, এটা তো অত্যন্ত আনন্দের বিষয়! আচ্ছা, এবারে একটু অন্য ব্যাপারে কথা বলি। প্রথম থেকেই দেখা গেছে, অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লিখছেন আপনি। “গায়ত্রীকে” --- এই এক ফর্মার কাব্যগ্রন্থ থেকেই। সম্প্রতি প্রকাশিত “সমান সমগ্র সীমাহীন”এও তাই। মাঝখানে অন্য কিছু ছন্দে লিখেছেন, বিশেষত গানগুলি রচনা করলেন যখন। তো, অক্ষরবৃত্তের ওপর এই পক্ষপাতিত্বের কারণ কী?

বিনয়ঃ ওভ্যেস, আর কিছু নয়। প্রথম থেকে ওটা লিখতে লিখতে পরে ওভ্যেসের মতো হয়ে গেলো। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে আমি কথা বলে যেতে পারি অনর্গল। একে নাম দিয়েছিলাম “অমিল পয়ার”। কলকাতার আড্ডায় এসব বিষয়ে কথা হতো। তা বীরেন দত্ত (কবি বীরেন্দ্র দত্ত) তো এই নামে একখানা বইই লিখে ফেললো।

গ্রন্থিঃ গানের প্রসঙ্গ উঠেছিলো একটু আগে ছন্দ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে। একসময় টানা বেশ কিছু গান লিখেছেন এবং যথারীতি সেসব ছাপাও হয়েছে কয়েকটা লিটল ম্যাগাজিনে। গান লেখার পেছনে কেমন ভাবনা কাজ করলো? এসব গানে সুরই বা কে দেবে?

বিনয়ঃ ও কিছু নয়। মাত্র পাঁচ-ছয়টা গান লিখেছিলাম। মূল্য দিইনি।

গ্রন্থিঃ তাই কি? আমরা কিন্তু আপনার অনেকগুলো গীতরচনাই পড়েছি পত্রপত্রিকায়।

বিনয়ঃ (হাত নেড়ে) না না, পাঁচ-ছয়টার বেশি হবে না কিছুতে। মূল্যবান নয়। আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথ গানের কথার --- উনি বলতেন বাণী --- চেহারা ঠিক করে দিয়েছেন। অন্য কেউ এটা পারেনি। আমি পুশকিন পড়েছি। পুশকিন অনেক গান লিখলেও গানের নির্দিষ্ট চেহারা দান করতে সক্ষম হননি। একটা উদাহরণ দিই। ধরো, কবির “সকরুণ বেণু বাজায়ে কে যায়” গানটি। প্রথমে “সকরুণ বেণু বাজায়ে কে যায় বিদেশী নায়ে/তাহারি রাগিণী লাগিল গায়ে” এদুটি হলো সম্পূর্ণ পংক্তি। তারপর সব অর্ধের লাইনের সমাহার ---
সে সুর বাহিয়া/ভেসে আসে কার/সুদূর বিরহ-/বিধুর হিয়ার/অজানা বেদনা/সাগরবেলার...।তারপর “অধীর বায়ে বনের ছায়ে”তে এসে লাইন শেষ হলো। আবার একইভাবে পরের স্তবকে---
ছবি মনে আনে/আলোতে ও গীতে---/যেন জনহীন নদীপথটিতে/কে চলেছে জলে কলস ভরিতে
এই অর্ধেক লাইনগুলিও “অলস পায়ে বনের ছায়ে”তে গিয়ে সম্পূর্ণতা পেল। এই যে দুটি সম্পূর্ণ বাক্যের মাঝখানে অর্ধেক বাক্য সাজিয়ে সাজিয়ে তৈরি রচনাকৌশল ---এ-জিনিস গানে রবীন্দ্রনাথের আগে কোনও দেশে কেউ করেছেন বলে আমার জানা নেই।

গ্রন্থিঃ বেশ, তাহলে অসমাপ্ত দ্বিতীয় প্রশ্নটিতে এবার ফিরে যাচ্ছি।“ফিরে এসো চাকা” ও “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা” ব্যতীত অন্য কবিতার বইতে কি এই কেন্দ্রিয় বিষয়বস্তুটি নেই? আর তাই তারা পাঠকমনে প্রতিক্রিয়া জাগায় না?

বিনয়ঃ ঠিক তাই। পরের বইগুলোতে বিভিন্ন কবিতা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। তাই সার্থকতা অর্জনে ব্যর্থ হলো।

গ্রন্থিঃ তবে এখন, এই সময়কালে যেসব কবিতা লিখছেন তাদের সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

বিনয়ঃ ওগুলো কবিতাই নয়। ছোট গদ্য। (তাঁর নিজস্ব ঢংযে টেনে টেনে আবৃত্তি করেন)
এখন শুধু গদ্য লিখি/তাও আবার কদাচিত
আসলে ভালো লাগে খাটে/থাকতে পড়ে সদা চিত
“শিলংয়ের চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখে গেছেন। আমারও এখন সেই অবস্থা। তবে রবীন্দ্রনাথ মহত প্রতিভা। এর পরেও সৃষ্টি করেছেন পূরবী, মহুয়া ইত্যাদি কাব্য। তার মতো অন্য কেউ নয়।
(আবার আবৃত্তি করেন পূরবী কাব্য থেকে দুটো পংক্তি। সরলার্থও করে দেন।)

গ্রন্থিঃ তাহলে দুটো প্রশ্ন মনে জাগছে। প্রথম হলো, মহত্তর প্রতিভার কি লক্ষ্মণ এটা যে তা অন্যের তুলনায় দীর্ঘ সময় ধরে ক্রিয়াশীল থাকে?

বিনয়ঃ হ্যাঁ, সে তো বটেই।

গ্রন্থিঃ দ্বিতীয় প্রশ্ন, যদি মনে করেন লিখতে পারছেন না, তবুও লিখছেন কি লেখার পুরনো ওভ্যেসে, না আমাদের মতো খুদে পত্রিকার লোকজনের চাপে পড়ে?

বিনয়ঃ তাগাদায়, শুধুমাত্র তোমাদের তাগাদার জন্যে। আসলে লেখার জন্যে এখন কোনও নতুন দরকারি চিন্তা খুঁজে পাই না। পেলে কবিতা সৃষ্টির আগ্রহ জন্মাতো। কবিতার বিষয়বস্তুই তার প্রধান জিনিস, লিখনশৈলী সেই বিষয়ের হাত ধরে আসে ---এইরকমই আমার মত।

গ্রন্থিঃ পরের জিজ্ঞাসায় যাই। আপনি এই বাড়িতে বসেই বেশ কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, ছন্দ ও অন্ত্যমিলে লিখলে সে কবিতা পাঠকের মনে থেকে যায়। কাজেই পাঠকের স্মৃতিতে কবিতাকে সুমুদ্রিত করার এটাই সেরা পদ্ধতি। এখনও কি তাই মনে করেন, কবি? তবে কি গদ্যে লেখা কবিতাগুলি মানুষ বিস্মৃত হবে কালে কালে?

বিনয়ঃ আজও তাই মনে হয়।

গ্রন্থিঃ কিন্তু ধরুন, লাতিন আমেরিকায় বা ইউরোপেও তো শুধু গদ্য কবিতার ছড়াছড়ি। মিটার নামক শব্দটা ওরা হয়তো ভুলেই গেছে। শুধু কিছু গানের কথা ছাড়া ---

বিনয়ঃ গানও আজ গদ্য হয়ে গেছে। আমিও তো গদ্যকবিতা লিখেছি, প্রথম লেখাটির নাম ছিল “আমার প্রথম গদ্যকবিতা”, বেরিয়েছিলো “রোপণ” পত্রিকায়। আমার ধারণা, লোকে গদ্যকবিতা পংক্তির পর পংক্তি --- এভাবে মনে রাখে না। মনে রাখে শুধু কবিতাটির বিষয়বস্তুকে।

গ্রন্থিঃ একটা আলোচিত বিষয় হলো, আপনার কবিতায় জীবনানন্দের রচনারীতির প্রভাব। এই ব্যাপারটা স্বয়ং বিনয়ের মুখ থেকে শুনতে চাই।

বিনয়ঃ (হেসে ওঠেন) আরে, জীবনানন্দের প্রভাব তো থাকবেই। ওর মতো লিখতে পারলে ধন্য হয়ে যেতাম। শক্তি একসময় চেষ্টা করেছিলো, উৎপল কুমার বসুও। (আবার হাসেন) আমি একবার বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী, আলোক সোম আর বাপী সমাদ্দারের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিয়েছিলাম যে জীবনানন্দ দাশ হলেন বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবি। সেটা আটলান্টিক লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরির পত্রিকায় ছাপা হয়ে গেল। সন্দীপ দত্ত আমাকে দেখিয়েছিল তার এক কপি।

গ্রন্থিঃ তাহলে আপনার প্রকৃত মত কী? বাংলা ভাষার সার্থকতম কবি কে, জীবনানন্দ না রবীন্দ্রনাথ?

বিনয়ঃ জীবনানন্দ হলো জটিল......কিন্তু...
(চুপ করে যান একটু অস্বস্তি নিয়ে। তবে কি তার পক্ষপাত রবীন্দ্রনাথের দিকেই? আমরা প্রশ্ন করি কিন্তু আর উত্তর আসে না। কিছুক্ষণের অপেক্ষা। কাঁপা হাতে প্যাকেট থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরান, টান দেন উপর্যুপরি।)

গ্রন্থিঃ এখনকার বাংলা কবিতায় মেয়েরা যৌনাকাঙ্খামূলক লেখাগুলো বেশ খোলামেলা ভাবেই লিখছেন। প্রতিষ্ঠিত কবিরা স্বাগতও জানাচ্ছেন এই পরিবর্তনকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গ্রন্থি-র বর্তমান সংখ্যাতেই তসলিমা নাসরিন লিখেছেন একটি গদ্য, নাম “নারী-শরীর”। আপনিও যৌনঅভিজ্ঞতার কথা সরাসরি (দু’একটি প্রতীকের আড়াল রেখে) লিখেছিলেন “ভুট্টা সিরিজ”এর কবিতায়। একটা ছোট বইও সম্ভবত হয়েছে কবিতাগুলো জড়ো করে। পরে আপনি তাদের disown করেন। আজ এই মুহূর্তে কি পাল্টাবেন মতামত? বা, এই ধরণের কবিতার কোনও স্থায়ি মূল্য কি আছে?

বিনয়ঃ (মৃদুস্বরে বলে যান) না, কোনও বই নেই তো! আমার জানা নেই এমন কোনও বইয়ের কথা। এগুলো উল্লেখযোগ্য লেখা নয় (অস্বীকারের ভঙ্গিতে হাত নাড়েন)। তবে মহিলা কবিরা চিরকাল ভালো কবিতা লিখে এসেছেন। “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে”, বা ওই লেখাটা “ফুটফুটে জ্যোৎস্নায়...“।
আর স্থায়ি মূল্যের কথা বলছো? দ্যাখো, প্রথমে যখন লিখতে শুরু করি তখন লক্ষ ছিলো পাঠককে জ্ঞান দান, তার বুদ্ধি বাড়ানো, কবিতাগুলিকে তার মনে রাখানোর চেষ্টা, তার সাথে যেন আমার কথাও মনে পড়ে সেদিকে নজর রাখা ইত্যাদি। কবিতা কীভাবে হয়, কীভাবে সার্থক, আমিও জানি না। হয়ে যায়, এই পর্যন্ত।

গ্রন্থিঃ কিছু গল্প লিখেছেন, আমরা জানি। কখনও উপন্যাস লিখতে ইচ্ছে হয় না?

বিনয়ঃ আমার লেখা তেত্রিশটা গল্প ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। তার তিরিশটা গল্প নিয়ে “কবিতীর্থ” বই করেছে, “বিনয় মজুমদারের ছোটগল্প”। উপন্যাস কোনওদিন লিখিনি, লিখতে ইচ্ছে করেনি।

গ্রন্থিঃ আলোচনার শুরুতে আপনি বলেছিলেন “ফিরে এসো চাকা”তে একটা কেন্দ্রিয় ভাবনা আছে। সে কি প্রেম, যার অপর নাম গায়ত্রী চক্রবর্তী? কীভাবে তার প্রতি মনোযোগী হলেন?

গ্রন্থিঃ আরে, আমি তো ছিলাম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র। তা, সেখান থেকে হলাম মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। আর গায়ত্রী প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরাজিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। এই কথা যেই জানলাম, ওমনি মনে হলো, এ-মেয়েও তো আমার মতো ডুবে যাবে, কেননা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়ার পর আমার পতন হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে কবিতার বইটি লিখে ফেললামঃ “একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে”, মানে একবার ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েই “দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে পুনরায় ডুবে গেল”, অর্থাৎ জীবনে আর কিছুই করতে পারলো না!
(কবি হাসতে থাকেন, ক্ষুরধার বুদ্ধিমানের কৌতুকভরা হাসি। হাসিমাখা চোখদুটো আমাদের মুখের ওপর ঘুরতে থাকে --- যেন বলছেন “কী, কেমন ব্যাখ্যা দিলাম একই সাথে আমার কবিতার আর তোমাদের প্রশ্নের? দারুন না!” আমরাও হেসে ফেলি। তার ঠকিয়ে দেওয়ার চেষ্টাটুকু উপভোগ করি সবাই, তবু আরও একটু তত্ত্ব-তলাশের ইচ্ছে বুড়বুড়ি কাটতে থাকে মনের মধ্যে।)

গ্রন্থিঃ গায়ত্রী চক্রবর্তী তো তলিয়ে যাননি। এখনকার গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম সেরা স্কলার। উত্তর-আধুনিকতার ব্যাখ্যাতা হিসেবে প্রায় তুলনাহীন, দেরিদা-র মূল্যায়নে ক্রিস্টোফার নরিস-দের ছাড়িয়ে গেছেন, এছাড়া সমাজতত্বের নানা মতবাদ বিষয়েও তার অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।

বিনয়ঃ আরে, আমি ওকে নিয়ে কাব্যগ্রন্থ লিখলাম বলেই না এতকিছু হলো!

গ্রন্থিঃ বেশ, তা নয় হলো। কিন্তু খোদ কবির যে অবস্থা ফিরলো না! তার তো একা একা দূর গ্রামে কেটে গেল গোটা জীবন।

বিনয়ঃ আমি কোনওদিন কিছু চাইনি।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেনঃ
বহুদিন মনে ছিলো আশা,
ধরণীর এক কোনে রচিব আপন মনে
এতটুকু বাসা।

জীবনানন্দ লিখেছেনঃ
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়,
আরও এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে

আমার আশাও নিতান্ত কম। আমি লিখেছিঃ
জাগতিক সফলতা নয়, শয়নভঙ্গির মতো
অনাড়ষ্ট সহজ বিকাশ সকল মানুষ চায়।

(একটু থেমে বিনয় নিজেই আগের প্রসঙ্গে ফিরে যান) তাছাড়া গায়ত্রীকে এক বিশেষ প্রেমের দৃষ্টিতে দেখেই যে আমি সব কবিতা লিখেছি, তা তো নয়। “অথবা করেছো ত্যাগ অবৈধ পুত্রের মতো......“ এমন লাইনও আছে ওই কাব্যগ্রন্থে।

গ্রন্থিঃ আমরা জানি, আপনি সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার মনোযোগী পাঠক। অনেক পত্র-পত্রিকাও পৌঁছোয় আপনার কাছে, যেমন এই মুহূর্তে “কলেজ স্ট্রীট” পত্রিকার একটা কপি ডাকে এসেছে। তো, এখনকার, মানে ধরুন নব্বই দশকে লিখছেন এমন কবিদের মধ্যে কার লেখা ভালো লাগে?
(বিনয় চুপ।আমরা প্রশ্নটা রিপিট করি এবং নব্বইয়ের কবিদের যতগুলো নাম মনে আসে বলে যেতে থাকি। অবশেষে নীরবতা ভাঙেন বিনয় মজুমদার।)

বিনয়ঃ আমি মোহিত চট্টোপাধ্যায়কে একবার বলেছিলাম, তিরিশ বছর পরপর একজন ভালো কবি জন্ম নেন কোনও ভাষায়। যেমন মধুসূদনের তিরিশ বছর পরে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের তিরিশ বছর পরে জীবনানন্দ, তার তিরিশ বছর বাদে শক্তি।

গ্রন্থিঃ শক্তি চট্টোপাধ্যায় তো পঞ্চাশের কবি। তাহলে তার তিরিশ বছর পরে আটের দশকের লেখকদের মধ্যে কোনও প্রধান কবির সন্ধান কি পাওয়া গেল?

বিনয়ঃ পঞ্চাশ না ভেবে যদি ষাট ধরা যায়, তবে তার তিরিশ বছর বাদে নব্বইয়ে একজন লিখছে, হিন্দোল ভট্টাচার্য। সেও বড়ো কবি হয়ে উঠতে পারে।

গ্রন্থিঃ হিন্দোল ভট্টাচার্য?

বিনয়ঃ আরও একজন আছে, মঞ্জুষ দাশগুপ্ত। কিন্তু সে তো মারাই গেল।

গ্রন্থিঃ আপনাকে নিয়ে টিভিতে একটা টেলিফিল্ম হয়, তাতে আপনার ভূমিকায় অভিনয় করেন কবি জয় গোস্বামী। দেখেছেন? কতোটা মিল আছে টেলিফিল্মে বর্ণিত কবির সঙ্গে বিনয় মজুমদারের জীবনের?

বিনয়ঃ দিনপঞ্জী লিখে লিখে এতটা বয়স হল
দিনপঞ্জী মানুষের মনের নিকটতম লেখা

(ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লাইনদুটো আবৃত্তি, আর কিছু বলতে চান না। জানা যায়, তিনি ফিল্মটা দেখেছেন প্রতিবেশি বাড়ির টিভিতে। কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেও টেলিফিল্ম নিয়ে কোনও মন্তব্য পাইনি। শুধু বললেন শেষে, “এক-দু ঘন্টার সিনেমায় কি গোটা জীবন ধরা যায়?”)

গ্রন্থিঃ অসুস্থতা ও বিনয় মজুমদার, স্বেচ্ছা-নির্বাসন ও বিনয় মজুমদার --- এগুলো সমার্থক হয়ে গেছে। যদি ধারাবাহিক অসুস্থতা না থাকতো, জীবন কি অন্য রকম হতো কিছু? যদি চাকরি থাকতো, কলকাতায় থাকতেন --- আরো বেশি লেখা হতো বা আলাদা ধরণের?

বিনয়ঃ আমার চাকরি টিঁকলো না রাশিয়ান ভাষা শিক্ষা করে ওই ভাষা থেকে নানা লেখা অনুবাদ করার কারণে। আর কী হলে কী হতো, তা ভাবি না। জীবন অন্য রকম হতে পারতো, কিন্তু এখন তো ওসব চিন্তা করে লাভ নেই!

গ্রন্থিঃ রাশিয়ান ভাষার চর্চা কি এখনও চালু রেখেছেন? ***“সমান সমগ্র সীমাহীন”-এর দ্বিতীয় কবিতায় লিখেছেন, “ই তাক দালিয়ে দালিয়ে”। এই শব্দগুচ্ছের মানে আপনার কাছে জানা হয়নি।

বিনয়ঃ আমি নিয়মিত রুশ ভাষা চর্চা করি। আমাদের এখানে রুশ জানা দুজন লোক আছে, গোবিন্দ দেব আর বিমল দে। এদের সাথে এই ভাষায় মাঝে মাঝেই কথাবার্তা চালাই। আর “ই তাক দালিয়ে দালিয়ে” মানে হল, ইত্যাদি, প্রভৃতি...ইংরাজিতে যাকে এট সেটেরা বলে।

গ্রন্থিঃ এখানে “সমান সমগ্র সীমাহীন” নিয়ে আর একটা প্রশ্ন করার লোভ সামলাতে পারছি না। এই বইয়ের এগারোতম কবিতাটি এই রকমঃ

তোমরা বিশ্বাস করো আমি এই
খাতাটির পৃষ্ঠাপরি যা লিখেছি
তার মধ্যে আমারই তো মুখ প্রতিবিম্বিত
হয়ে দেখা যায় আরও এই সব
লেখাগুলি ছাপা হয়ে বেরোলেও
সেই ছাপা হরফের জায়গায়
এ-আমার মুখখানি দেখা দেবে
সকলেরই এই হয়, দেবদেবীদের হয়
মানুষের এই হয় পোস্টকার্ডে
চিঠি লিখলেও হয় প্রতি মানুষের হয়।
সুইডেনে গিয়ে দেখো সুইডেন দেশটির
সম্রাট বিনয়, সব খবরকাগজে ছবি ছাপা

এই বারো লাইন-বিশিষ্ট কবিতার প্রথম দশ লাইন একভাবে বুঝতে পারি। আপনার অন্যসব কবিতার মতোই এখানেও এক টুকরো বিনয় মজুমদারীয় ভাবনার আসা-যাওয়া। বিশেষত পোস্টকার্ডের উদাহরণ যেখানে আনা হয়েছে তা খুব চেনা। পুরনো সিনেমায় দেখা যেত কেউ চিঠি পড়ছে এবং মধ্যে গোল হয়ে লেখকের মুখচ্ছবি ভেসে উঠলো। কিন্তু শেষ দু’লাইনের মর্মোদ্ধার একেবারেই করতে পারিনি। “সুইডেন দেশটির সম্রাট বিনয়” কীভাবে?

বিনয়ঃ একসময় সুইডেনের রাজা ছিলেন গুস্তাভ। খুব লম্বা চেহারা। আমাদের ইন্দিরা গান্ধি গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। ছবিও ছাপা হয়েছিলো। এই সুইডেন দেশই তো নোবেল পুরষ্কার দেয়।

গ্রন্থিঃ তাহলে কি আপনার কখনো মনে হয়েছিলো (বা, এখনও মনে হয়), আমার সাহিত্যসৃষ্টি এই সর্বোচ্চ সম্মান পাওয়ার যোগ্যতা দাবী করে?

বিনয়ঃ (সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করেন) না না। কখনই এইরকম কথা বলতে চাইনি।

গ্রন্থিঃ সমান সমগ্র সীমাহীন-এর পর আপনার সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ কী?

বিনয়ঃ মাঝখানে আমি কিছুদিন কবিতা লেখা ছেড়ে জ্যামিতিচর্চা করছিলাম। ঠাকুরনগর স্টেশানের দু নম্বর প্ল্যাটফর্মে বসে কাগজে জ্যামিতির নানা আঁকিবুকি কাটতাম। জ্যামিতির ভাবনা থেকেই কিছু লেখা তৈরি হয়েছিল। সেসব রচনা আছে “শিমূলপুরে লেখা কবিতা” বইটিতে; “কবিতীর্থ” প্রকাশ করেছে গত পুস্তকমেলায়।

গ্রন্থিঃ আপনাকে আর বেশিক্ষণ বিরক্ত করবো না। অনেক প্রশ্নের উত্তর দিলেন, এ আমাদের পরম সৌভাগ্য। অনেক অদরকারি ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করেছি।

বিনয়ঃ আমিও তো অনেক কথাই ফাঁস করে দিলাম (হাসতে থাকেন)।

গ্রন্থিঃ একজন কবিতা-পাঠক হিসেবে যখন কবি বিনয় মজুমদারের মহত্ব বা uniqueness-এর কারণ খুঁজতে বসি, মনে হয় বৈজ্ঞানিক মনন, বৈজ্ঞানিক যুক্তিপদ্ধতি আর বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতাকে কাব্যরসে আগাগোড়া ডুবিয়ে হাজির করার অভূতপূর্ব গুণটিই আপনার কাব্য-সার্থকতার জন্যে এক নম্বর কৃতিত্ব দাবী করতে পারে।“ফিরে এসো চাকা”র খুব জনপ্রিয় কয়েকটা লাইন তুলে দিচ্ছি উদাহরণ হিসেবে। “মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়” --- এই লাইনের শিরদাঁড়া একটি বৈজ্ঞানিক সাধারণ জ্ঞান বা বা যুক্তিসিদ্ধ পর্যবেক্ষণ ছাড়া আর কিছু তো নয়। অথচ এটি এক শ্রেষ্ঠ পংক্তি হয়ে উঠলো কীভাবে? “প্রকৃত” শব্দের প্রয়োগের জন্যে। “মানুষ নিকটে গেলে সারস উড়ে যায়” প্রায় কোনও কবিতাই তৈরি করছে না। “মানুষ নিকটে গেলে কাক উড়ে যায়” আরও খারাপ। “সারস” শব্দের সুদূরপ্রসারী সৌন্দর্য নিশ্চয়ই সাহায্য করেছে পংক্তিটাকে। কিন্তু মূল ম্যাজিক ওই “প্রকৃত”য়। সে লাইনটার কতগুলো অর্থ তৈরি করছে দেখা যাকঃ-
ক) বাজারি মানুষেরা কাছে গেলে সাধকেরা দূরে চলে যান।
খ) প্রকৃত সারস অর্থাত শুদ্ধ সৌন্দর্য শুধু নির্জনতাতেই বাসা বাঁধে।
গ) জীবনের গূঢ় রহস্যময় জ্ঞান মানুষের অধরা চিরকাল।
ঘ) মানুষের আশা ও স্বপ্ন তার অর্জনের বাইরেই থেকে যাবে।
......ই তাক দালিয়ে দালিয়ে।
এইভাবে হয়তো এন-নাম্বার (আপনার ভাষায় ঢ়-সংখ্যক) মানে করা যেতে পারে।

একইভাবে “একটি উজ্জ্বল মাছ...পুনরায় ডুবে গেল” এই দীর্ঘ-বিখ্যাত কবিতার লাইন মূলত বিধৃত করছে ক্লাস নাইনের ফিজিক্সের জ্ঞানকে, একটি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিশিয়ে। আমরা সবাই পড়েছি, জলের নিজস্ব রঙ নেই। গভীর জলের মধ্যে আলোকরশ্মি প্রবেশ করলে রশ্মিগুচ্ছ বর্ণালীতে বিশ্লিষ্ট হয়। বর্ণালীর সাত বর্ণের সাতটি বিভিন্ন চ্যুতিকোন আছে। জলের গভীরতার ওপর নির্ভর করে যে নির্দিষ্ট রঙের চ্যুতি চোখের অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়, আমরা জলকে সেই রঙেই রঞ্জিত দেখি। আপনি “দৃশ্যত সুনীল” না লিখে “দৃশ্যত সবুজ” বা “দৃশ্যত তমস” (যেখানে সব রঙ শোষিত) লিখতে পারতেন। কিন্তু লাইনটায় কবিতা সৃষ্টি হল “প্রকৃত প্রস্তাবে” শব্দবন্ধ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে। বিজ্ঞানভাবনার হাড়কাঠামোর ওপর সৌন্দর্যের মাংস-ত্বক বসিয়ে দিলো সে। এইরকম নানা উদাহরণ আছে। যেমন মশা উড়ে গেলে তার এই উড়ে যাওয়া “ঈষত সংগীতময়” হয়ে থাকে যে, সেই বিষয়টা।
এখন কথা হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক মননকে এভাবে বাংলাকবিতায় তো কেউ আনেননি।

বিনয়ঃ তোমাদের এই কথাটা ভুল হলো। প্রাচীন কালেও কবিরা বিজ্ঞানভাবনা থেকে কাব্যের আঙ্গিক সৃষ্টি করে নিয়েছেন। আমি যে খুব নতুন কিছু করলাম, তা নয়। যেমন ধরো, কালিদাসের “কুমারসম্ভব কাব্য”। একটি দৃশ্যে যখন হরপার্বতীর বিয়ে হচ্ছে, কালিদাস লিখলেন, পৃথিবীর চারদিকে যেমন আলো আর অন্ধকার ফিরে ফিরে আসে, তেমনে শিব আর উমা আগুনের চারপাশ প্রদক্ষিণ করছেন। এটা তো বিজ্ঞানই। অথবা, এই সংস্কৃত শ্লোকটি লক্ষ করোঃ হংসের্যথা ক্ষীরম অম্বু মধ্যাত। মানে হলো, হাঁস যেমন অম্বু অর্থাৎ জলের ভেতর থেকে ক্ষীর (বেছে নেয়)। তো, এটাও তো সেই তোমার ভাষায় যুক্তিসিদ্ধ বা বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে কাব্যে প্রকাশ করা। নয় কি? আমিও লিখেছি, “ব্রোঞ্জের জাহাজ আছে যেগুলি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয় না। এরূপ জাহাজে বৈজ্ঞানিক সামুদ্রিক গবেষণা করে।“ এই কবিতাটি “গায়ত্রী” কাব্যগ্রন্থে আছে। “ফিরে এসো চাকা”তে নেওয়া হয়নি।

গ্রন্থিঃ বেশ। কিন্তু পরের দিকের কাব্যগ্রন্থে আর একটা জিনিস লক্ষ করা গেল। বিজ্ঞান বা অঙ্কের কোনও কনসেপ্ট-কে আপনি মানবজীবনের কোনও ঘটনার মতো উল্লেখ করছেন কবিতায়। বা, বহু জায়গায় অঙ্কের সূত্র দিয়ে মানুষের জীবনকে ব্যাখ্যা করতে চাইছেন। বিজ্ঞান ও অঙ্কের সূত্রেরা এভাবে রক্তে-মাংসে জীবিত হয়ে উঠছে।

বিনয়ঃ মনুষ্যীকরণ। মনুষ্যীকরণ। আর কিছুই না। সেই সময়ে বিজ্ঞানের বেশ কিছু বই অনুবাদ করতে হয়েছিলো আমাকে। বইগুলো মন দিয়ে পড়ে দেখলাম, বৈজ্ঞানিক সত্যদের মানুষের জীবনের সঙ্গে মেলানো যায়। এবং এটা কবিতা লেখার নতুন এক পদ্ধতি হতে পারে।

গ্রন্থিঃ সীমা, অসীম, কল্পনা, ব্যোম, রেখা ইত্যাদি আঙ্কিক ধারণাগুলোকে আপনি মানব বা মানবীচরিত্র দিতে লাগলেন কবিতায়। জ্যামিতির ওপরও আপনার অসম্ভব টান লক্ষ করি।

বিনয়ঃ ঠিক তাই। আচ্ছা, আমি হচ্ছি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। একটা কথা আছে, ড্রয়িং ইজ দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অফ এঞ্জিনিয়ারস। আমি যদি একটি ড্রয়িং এঁকে পাঠিয়ে দিই, তবে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তেই একজন ইঞ্জিনিয়ার সেটি দেখে বুঝতে পারবে আমি কী বলতে চেয়েছি। নানারকম ভাবনা মনে আসে। ধরো, ম্যাক্সিমা-মিনিমা বিষয়টা। একটা কার্ভড লাইনের পয়েন্ট অফ ইনফ্লেক্সন-এ কার্ভটাকে ডিফারেনশিয়েট করলে পাচ্ছো একটা পজিটিভ ম্যাক্সিমা, তাকে আবার ডিফারেনশিয়েট করলে আসবে নেগেটিভ স্ট্রেইট লাইন, তাকে ফের ডিফারেনশিয়েটের ফল হলো, নেগেটিভ মিনিমা বা ইনফিনিটি...অর্থাত অসীম। সুতরাং, কার্ভটির পয়েন্ট অফ ইনফ্লেক্সন-এ কী ঘটছে, তার ডায়াগ্রাম এঁকে আমি একখানা জেরক্স করে রেখে দিয়েছি।

গ্রন্থিঃ আপনার আরেকটি চূড়ান্ত রহস্যময় কবিতা হলো, সমান সমগ্র সীমাহীন-এর ছ’নম্বর লেখাটিঃ
একটি বিড়ি ধরিয়ে সেই পোড়া দেশলাই
কাঠি দিয়ে আমি
টেবিলে লিখেছিলাম অসীম এক নং যোগ
অসীম দুই নং যোগ অসীম তিন নং
যোগ ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা
ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা যোগ অসীম ঢ় নং
সমান সমগ্র সীমাহীন শূন্য সমগ্র অসীম
আরও আমি কিছু রেখাকর্ম করে (যা এর পরের
কবিতায় লিখে দেবো) পেলাম অসীম সিংহ
পেলাম অসীম বালা, অসীম মজুমদার
পেলাম অসীম রায়, ভাইরে অসিম।।

আমরা জানি ইনফিনিটি অবিভাজ্য। তো এই অসীমকে ভাগ করা বা বিভিন্ন অসীমের
ধারণা করা কীভাবে সম্ভব?

বিনয়ঃ কতগুলো চিন্তা আমার মাথায় অনেকদিন ধরেই ঘুরপাক খায়, এটি তার অন্যতম। ধরা যাক, আমাদের এই ঠাকুরনগরে এক বিঘে বর্গক্ষেত্রাকার জমি আছে, অর্থাৎ দৈর্ঘ্যে এক বিঘে, প্রস্থেও এক বিঘে। এবার যদি মাটির ওপর ওই জমির অংশটুকু কল্পনা করি, তবে তা আকাশ ছাড়িয়ে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যাবে। একই ভাবে জমিটি মাটির নিচেও নেমে যেতে যেতে অসীম পর্যন্ত ছড়িয়েছে। কাজেই এক বিঘে বর্গক্ষেত্রের এক টুকরো অসীম পাওয়া গেল।

গ্রন্থিঃ কিন্তু বর্গক্ষেত্র তো দৈর্ঘ্য আর প্রস্থের গুণফল, তার অস্তিত্বের ধারণা শুধুমাত্র টু ডাইমেনশনাল। সেটি আকাশে বা পাতালে প্রসারিত হওয়ার উপায় কোথায়?

বিনয়ঃ বেশ, তাতে নয় আমি আরেকটা মাত্রা জুড়ে দিলাম। সুতরাং, ত্রিমাত্রিক কল্পনা করতে আর অসুবিধে নেই। এইভাবে, ধরো, ওই এক বিঘে বর্গক্ষেত্রের পাশে আর এক টুকরো এক বিঘের বর্গক্ষেত্র, তার পাশে আরও একটা...এইভাবে টুকরো টুকরো অসীমকে পেয়ে যাচ্ছি। এই অংশগুলির কোনওটির নাম দেওয়া যায় অসীম বালা, কেউ অসীম রায়, কেউ অসীম মজুমদার ইত্যাদি। আবার এই সব আলাদা অসীমের যোগফল এক পূর্ণ অসীমও কিন্তু রয়েছে। সে যেন এক ঈশ্বর, এই ব্রহ্মাণ্ডের রাজা। সম্পূর্ণ অসীম যেন এইসব ছোট ছোট অসীমের সাহায্যে আমাদের বিশ্বকে শাসন করে চলেছে।

গ্রন্থিঃ অসাধারণ! তাহলে এইরকম বলা যায় যে, আপনার “ফিরে এসো চাকা” ও “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা”য় বিজ্ঞান ও কবিতার মধ্যে অন্তর্নিহিত জারণ-বিজারণ প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে লেখাগুলো মাথা তুলে দাঁড়াতো। কিন্তু ক্রমে আপনি সেই পদ্ধতির অনুসরণ বন্ধ করলেন। আপনার লেখায় সরাসরি ফুটে উঠতে লাগলো বাইনোমিয়াল থিয়োরেম বা ইন্টেগ্রাল ক্যালকুলাস বা ইন্টারপোলেশান সিরিজ --- মানবজীবনে তার প্রয়োগের দুঃসাহসিক রূপকার্থ নিয়ে। বিজ্ঞান, অঙ্ক আর জ্যামিতির শুদ্ধতা দিয়ে আপনি বাংলা কবিতাকে স্নান করিয়ে দিচ্ছেন।

বিনয়ঃ (বাধা দিয়ে) কিন্তু এইসব লেখার কোনও সার্থকতা নেই। এ একান্তই আমার নিজের চিন্তা। কারও কোনও কাজে লাগবে না
(বিনয়-কবি চুপ করে যান হঠাত। চুপ তো চুপই। বিষণ্ণতা নেমে আসছে সারা অবয়বে। চোখ মুখোমুখি দেওয়ালের দিকে, কিছুই-না-দেখার চোখ)।

গ্রন্থিঃ হয়তো আপনার কবিতা জনসাধারণ থেকে জনবিশেষের আস্বাদনের জিনিস হয়ে যেতে পারে এই পরিবর্তনের ফলে। তাতে কী? আজীবন শিল্পের অর্থই হলো শুদ্ধতার চর্চা। সেই প্রয়াস মানুষের কাজে লাগা না-লাগার গুজবে কোনওদিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, হবেও না।

বিনয়ঃ নাহ! রবীন্দ্রনাথের “সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর” গানটির মূল্য আছে। কিন্তু আমার লেখা অসীম বিষয়ক কবিতার দাম নেই।

(আর কথা বলানো যায়নি কবিকে। তার নীরবতা যেন আমাদের বিদায়-অভ্যর্থনা। দমচাপা মন নিয়ে উঠে পড়ি। দরজার গোড়ায় এগিয়ে আসেন মন্থরভাবে। প্রণাম করবো বলে নিচু হই। তবুও নিঃশব্দ-মুখ। কালো-সবুজ মানবহীন একটা পথ হেঁটে ফিরে যাই --- বিনয়ের শেষ বলা কথা ক’টির প্রতি অসীম অবিশ্বাস সঙ্গে থাকে)।।

বোলপুরে বৃষ্টি

বোলপুরে বৃষ্টি

কপালে গোল সবুজ-আলো টিপ যাদের এখন, মানে যারা এইমাত্র গদ্যটা নিয়ে বসলে, আর যারা নেট বন্ধ করে অদৃশ্য হয়ে বাস্তব হয়ে আছো, সবাই শোনো। তখন আমি --- বাবু শ্রীবাস, বোলপুর নিবাস! সপ্তাহের শেষে অফিস থেকে বাড়ি, তারপর রবিবার সন্ধেবেলা পাড়ার মাঠের নিরাপত্তাকর্মী যে ঝাঁকড়া কদমগাছটা, তার নিচে ভিজে পরাগরেণু মেশানো চা খাই তিন-চার বন্ধুতে। পাশে রেলের লেভেল-ক্রসিং, তরকারি-বাজারের হলুদ বাল্বের আলোয় ফিগার দেখাচ্ছে ছিপছিপ বৃষ্টিকিশোরী। সেদিকে তাকিয়ে এক বন্ধু, বইয়ের দোকানে বসে যার সারাদিন গড়াতো --- “বোলপুরের বর্ষা কেমন রে! এখানকার মতোই?”
ধরো, কথাটা আমার কানেই ঢোকেনি। হতে পারে, ছ’টা পঞ্চান্নর বনগাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে দিয়ে স্টেশান পেরোচ্ছিল তখন। কতোদিন লোকাল ট্রেনের ভিড়ধাক্কা মাখি না গায়ে, আমার পরমাত্মার লোভী বেড়ালটার সে-কথা ভাবতে থাকাও কারণ হতে পারে। না হলে বিড়বিড় করে উঠবো কেন, আমরা যখন সদ্য চাকরি পেলাম, তখনও কি এতো লোক উঠত ট্রেনে? মোটেই না.........।

সকালের আটটা বেয়াল্লিশ ধরতাম। যেদিকে বসেছি --- আমি, ষষ্ঠীতলার তপনদা, কাশিমপুরের সুবীর মুখার্জী, উলটো কোনায় একজোড়া ছেলে-মেয়ে উঠতো পরের স্টেশান থেকে এমনভাবে যে, এ-বি-সি-ডি কামরা-চতুর্ভুজের সি(চন্দন) বিন্দু থেকে কর্ণ টানলে তাদের বসা(বি) ছুঁয়ে দেবে, যত খারাপ সম্পাদ্যই আমি আঁকি না কেন। এবার পাশাপাশি জানলার ধারে কোলের ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে তারা কথা শুরু করতো। সারা রাস্তার সংলাপ।
তো, প্রেম আমার কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘায় ভোরের রোদের দ্বিগুণ উচ্চতামাখা, একমাত্র প্রেমকে জেতাতেই ছাপ্পা ভোট মেনে নিতে পারি। যখন রাস্তায়-রেস্তোরাঁয় প্রেমিক-প্রেমিকা একে অন্যের দিকে মুখ তুলে তাকায়, যে কোনও দেবতামূর্তির চেয়ে সুন্দর সেই ফ্রিজ-ফ্রেম, সে-চোখের তারা স্পিভাক বা চ্যাপলিনের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান। তখন মড়ক, শিশুহত্যা, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ --- নর্দমার জমা জল ছুঁতে পারে না কারও পায়ের পাতা, এবং কোনও ৪০৭-এর বাপের ক্ষমতা হয় না তাদের “তোদের বাড়ি যাব আজ” বা “খুব সাহস, না !”-র ওপর চালিয়ে দিতে গোল-গোল হিংসুটি দশচাকা। সিম্পলি পারে না!

তাই আমি লাইভ প্রেম দেখার জন্যে মাঝে-মাঝে লগ অন করতাম ওই সি-বি কর্ণ বরাবর, মানে ওই রোপওয়ে-পথে কভী কভী বসিয়ে দিতাম চোখজোড়া... যাও পাখি ঘুরে এসে ভ্রমণকাহিনি শুনিও। যদিও মার খেত সম্প্রচার, লোকজনের ওঠা-নামাতে লিংক ছিঁড়ে হারিয়ে যেত মুখদুটো, আবার ভেসে উঠেছে --- ছোটোবেলার রেডিও সিলোন! কিন্তু গভীর দুঃখের সঙ্গে দেখতে পাচ্ছি খুব যেন জমেনি জুটিটা, একজন প্রকৃত দর্শক ও সাপোর্টার হিসেবে উদ্বেগ আমার সঙ্গী হয়ে গেল যখন সারাক্ষণ তার নিটোল ফর্সা তর্জনী তুলে মেয়েটা প্রেমিকের নাকের সামনে নাচাতে থাকে আর সেই ছেলে বিষণ্ণ মুখে বারবার মাথা নাড়িয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে নেয়। প্রেমিকার এক-বুক রাগী নালিশের সামনে সে এক অসমাপ্ত হাবুডুবু......মুখ নিচু করে যে নিজের অধঃপতিত অবস্থাটার ঠিক-ঠাক মুআয়না করবে, তারও সুযোগ তোকে দেব না শয়তান, কেননা ওই যে, বাঁ-কাঁধে কাঁঠালিচাঁপা আঙুলের খোঁচা, আবার শিরদাঁড়া সোজা করে বসো, ডাইনে-বাঁয়ে মুন্ডু নাড়ো পারকিনসন্স ডিজিজ!

কিছুদিন পরে আমারই ডিপ্রেশান হতে থাকলো। শচীন-শ্রীনাথের জুটির ওপর অতটা ভরসা রাখা উচিত হয়নি --- উনি এন্তারসে চার-ছয় হাঁকাতে ব্যস্ত, এদিকে পার্টনারের গায়ে কালশিটে দাগ বাউন্সারের, কোনওভাবে উইকেট বাঁচিয়ে রাখার খেলা খেলছে! ট্রাজেডি নিতে পারি না বলে আমি আজীবন শেক্সপীয়ার-মূর্খ জীব......... তাই, সি-বি কর্ণের ওপর ধুলো জমতে থাকল, শুকনো পাতার খড়খড়িয়ে প্রস্থানের নিচে ঘাস গজালো আস্তে, দৃষ্টিচিহ্ন মুছে দেবে বলে।

বেশ কিছুদিন পর......হয়তো বন্ধুরা আসেনি, হয়তো হাতের বইয়ে মন বসছে না, চোখ অন্যমনস্কভাবে হাঁটা লাগায় পুরনো পথে আর এক আশ্চর্য ছবি দেখে মাঝপথেই আনন্দময় বৃষ্টিময় হার্ট অ্যাটাকের মতো হয়ে যায়! সেই মেয়ে --- যার কাঁধ থেকে জলপ্রপাতের মতো নামা দুটো হাত নিজেরই কোলের ওপর বুড়বুড়ি কাটছে আর চিবুক একটু ডুবে এসে এই প্রথম মাথার সরু, প্রায়ান্ধকার সিঁথি দেখিয়ে দিল --- হাসছে সে! তার অপরাধী ও লাঞ্ছিত প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে হাসছে পূর্ণ খুশির, আরও এক কেজি অবাক এখানে যে, সেই হাসি লাজুক মুগ্ধতারও। তার মানে কতো কতো স্তবক মুখ-নাড়ায় একটা সোহাগের দাম, ভাবো!
আমারই চোখের সামনে এই প্রথম ছেলেটার শরীর থেকে বিষণ্ণতার শ্যামরঙ সরে গেল। এতদিনের দুঃস্বপ্নের জীবানু, মনখারাপের তেলচিটে গন্ধ...... সে হাঁটু মুড়ে বসেছে, হাসিস্নানে সব ধুয়ে নেবে!

বিনয় মজুমদার

বিনয় মজুমদার

উনিশশো চুরানব্বই সালের শীতঋতু। কবি বিনয় মজুমদার মানসিক রোগে অসুস্থ, দিন পনেরো হল ভর্তি আছেন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

কবির উন্মত্ততার কিছু চিহ্ন তখনও শান্তকারি ওষুধের প্রভাব ঠেলে বেরিয়ে পড়ছে। ডাক্তার ম্যাডাম ডেকে মন্ত্রণা দিলেন --- কতোদিন কবিতা লেখেন না, বিনয়বাবু? ওকে লেখাতে বসান আবার। অনেক সহজে নিরুত্তেজ হয়ে যাবেন।

ধরলাম গিয়ে। কিন্তু সব অনুরোধ ফিরতে লাগল বে-জবাব। শেষে এক ফুটকড়াই-বন্ধুর মুখ থেকে যেই বেরিয়েছে --- আহা, তোরা বোঝার চেষ্টা কর, উনি সত্যিই অনেকদিন কিছু লিখতে পারছেন না রে! শরীরটা কবে থেকে খারাপ, বল তো? --- আস্তে মাথা তুললেন বিনয়। তেরছা দৃষ্টি বকন্দাজ ছেলেটার দিকেঃ কাল সকাল দশটায় একখানা রুলটানা দু’নম্বর খাতা নিয়ে চলে আসবে। ঠিক দশটায়। দু’ঘন্টায় চোদ্দোটা কবিতা। আর, সামনের দু’পাতায় থাকল কবির নাম, প্রকাশকের ঠিকানা ইত্যাদি। ব্যাস, সুন্দর একফর্মার কবিতার বই। সাত দিনের মধ্যে ছেপে বার হয়ে যাবে।

ডান হাতের কম্পমান বুড়ো আঙুল আর মধ্যমা একজোট হল, চটাশ করে তুড়ি একখানা। মুখের ভাঁজরেখা, স্বচ্ছতাহীন চোখ, মাথার সাদা-কালো কঠিন চুল ---এই শীর্ণ পরাক্রমের কোথাও এক ভগ্নাংশ হাসি ফুটল কি? ওই হাসির কি জানা আছে, আগামিকাল সরস্বতীপুজো!

চারদিকে শহরের পরাধীন সন্ধ্যা নেমে আসছে। বিছানা ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের কারও মুখে অরক্ষিত চিড়িয়াখানায় ঢুকে পড়ার উদ্বেগ, কেউ দাঁড়িয়ে জাদুঘরের প্রত্নশিলার সামনে, কেউ আবার তুচ্ছালোকিত তারামণ্ডলের মধ্যে চিনতে চাইছে কালপুরুষ। মানুষ একটাই, অথচ, নানা দর্শকের চোখে নানারকম সাইটসিয়িং-এর উত্তেজনা।

হঠাৎ ঘরভর্তি গুনগুন চুপ করে গেল। বিনয়ের কাঁপা কাঁপা তর্জনী উঠছে দেওয়ালের দিকে। বাইরে কলকাতার উচ্ছিষ্ট আকাশ। তাকে আঘাত করতেই কি ঠোঁটদুটো গুটিয়ে নখরের মতো হয়ে উঠেছে? না। ওই শূন্যতায় কবি নিজের কাব্যগ্রন্থটি দেখতে পেয়েছেন। কিছুক্ষণ বিনয়ী নীরবতা। তারপর একঝাঁক ক্ষুধিত কবি-শব্দ ছিটকে বেরিয়ে এল ---

পৃথিবীর সব প্রকৃত কাব্যগ্রন্থই এক ফর্মার।

(প্রকাশিত)

Photo: উনিশশো চুরানব্বই সালের শীতঋতু। কবি বিনয় মজুমদার মানসিক রোগে অসুস্থ, দিন পনেরো হল ভর্তি আছেন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। 

কবির উন্মত্ততার কিছু চিহ্ন তখনও শান্তকারি ওষুধের প্রভাব ঠেলে বেরিয়ে পড়ছে। ডাক্তার ম্যাডাম ডেকে মন্ত্রণা দিলেন --- কতোদিন কবিতা লেখেন না, বিনয়বাবু? ওকে লেখাতে বসান আবার। অনেক সহজে নিরুত্তেজ হয়ে যাবেন।

ধরলাম গিয়ে। কিন্তু সব অনুরোধ ফিরতে লাগল বে-জবাব। শেষে এক ফুটকড়াই-বন্ধুর মুখ থেকে যেই বেরিয়েছে --- আহা, তোরা বোঝার চেষ্টা কর, উনি সত্যিই অনেকদিন কিছু লিখতে পারছেন না রে! শরীরটা কবে থেকে খারাপ, বল তো? --- আস্তে মাথা তুললেন বিনয়। তেরছা দৃষ্টি বকন্দাজ ছেলেটার দিকেঃ কাল সকাল দশটায় একখানা রুলটানা দু’নম্বর খাতা নিয়ে চলে আসবে। ঠিক দশটায়। দু’ঘন্টায় চোদ্দোটা কবিতা। আর, সামনের দু’পাতায় থাকল কবির নাম, প্রকাশকের ঠিকানা ইত্যাদি। ব্যাস, সুন্দর একফর্মার কবিতার বই। সাত দিনের মধ্যে ছেপে বার হয়ে যাবে।

ডান হাতের কম্পমান বুড়ো আঙুল আর মধ্যমা একজোট হল, চটাশ করে তুড়ি একখানা। মুখের ভাঁজরেখা, স্বচ্ছতাহীন চোখ, মাথার সাদা-কালো কঠিন চুল ---এই শীর্ণ পরাক্রমের কোথাও এক ভগ্নাংশ হাসি ফুটল কি? ওই হাসির কি জানা আছে, আগামিকাল সরস্বতীপুজো!

চারদিকে শহরের পরাধীন সন্ধ্যা নেমে আসছে। বিছানা ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের কারও মুখে অরক্ষিত চিড়িয়াখানায় ঢুকে পড়ার উদ্বেগ, কেউ দাঁড়িয়ে জাদুঘরের প্রত্নশিলার সামনে, কেউ আবার তুচ্ছালোকিত তারামণ্ডলের মধ্যে চিনতে চাইছে কালপুরুষ। মানুষ একটাই, অথচ, নানা দর্শকের চোখে নানারকম সাইটসিয়িং-এর উত্তেজনা।

হঠাৎ ঘরভর্তি গুনগুন চুপ করে গেল। বিনয়ের কাঁপা কাঁপা তর্জনী উঠছে দেওয়ালের দিকে। বাইরে কলকাতার উচ্ছিষ্ট আকাশ। তাকে আঘাত করতেই কি ঠোঁটদুটো গুটিয়ে নখরের মতো হয়ে উঠেছে? না। ওই শূন্যতায় কবি নিজের কাব্যগ্রন্থটি দেখতে পেয়েছেন। কিছুক্ষণ বিনয়ী নীরবতা। তারপর একঝাঁক ক্ষুধিত কবি-শব্দ ছিটকে বেরিয়ে এল --- 

পৃথিবীর সব প্রকৃত কাব্যগ্রন্থই এক ফর্মার।   
 
                                                                                চন্দন ভট্টাচার্য

বাস্তবতা কী?/স্টিফেন হকিং আর লিওনার্দ লোদিনো (অনুবাদ আমার)

(স্টিফেন হকিং আর লিওনার্দ লোদিনো-র লেখা “দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন” বইয়ের ‘হোয়াট ইজ রিয়ালিটি’ প্রবন্ধের কিছু অংশ। অনুবাদ আমারই।) 

বাস্তবতা কী?

কয়েক বছর আগে ইতালির মোনজা শহরের পৌরসভা গৃহপালিত পশু-পাখির মালিকদের গোল পাত্রে গোল্ডফিশ রাখার ওপর নিষেধ জারি করেন। ব্যবস্থাগ্রহণকারীরা তার পদক্ষেপের কিছুটা ব্যাখ্যা দেন এই বলে যে একটা মাছকে বক্রতল-বিশিষ্ট পাত্রে রাখা একরকম নিষ্ঠুরতা, কেননা বাইরের দিকে তাকালে মাছ বাস্তবের একটা অযথার্থ চেহারা দেখছে। কিন্তু আমরা কী করে জানতে পারলাম যে আমাদের কাছেই বাস্তবের সত্য ও অবিকৃত চেহারাটা আছে? এমন নয় তো যে আমরাই রয়েছি বড়ো গোল্ডফিশ-পাত্রের ভেতর আর একটা বিশালাকায় লেন্স আমাদের দৃষ্টি বিকৃত করে দিচ্ছে? গোল্ডফিশের বাস্তবের প্রতিচ্ছবি আমাদের চেয়ে আলাদা, কিন্তু আমরা কি নিশ্চিত হতে পারি যে সেটা কম বাস্তব?

সোনালিমাছের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সঙ্গে মেলে না, তবুও তারা বৈজ্ঞানিক নিয়মের সূত্র আবিষ্কার করতে পারে যার সাহায্যে পাত্রের বাইরে দেখা বস্তুর গতিবেগ শাসন করা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলি, একটা স্বাধীন ভ্রমণশীল বস্তু যেটা আমাদের চোখে সরলরেখায় চলছে বলে মনে হয়, বিকৃতির জন্যে ওদের চোখে বক্ররেখা-অনুসরণকারী হিসেবে ধরা দেবে। সে যাই হোক না, সোনালিমাছ তাদের বিকৃত দৃশ্য-বাস্তবতা থেকেই বৈজ্ঞানিক সূত্র প্রণয়ন করতে পারে যেটা তাদের ক্ষেত্রে সবসময়ই সত্যি হবে এবং যার সাহায্যে পাত্রের বাইরের বস্তুর ভবিষ্যত গতির ব্যাপারে অনুমান করতেও সক্ষম হবে তারা। আমাদের দৃশ্যজগতের নিয়মগুলো থেকে ওদেরটা আরও জটিল, কিন্তু সরলতা তো কেবলমাত্র রুচির ব্যাপার। কোনও গোল্ডফিশ এমন থিয়োরি তৈরি করলে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবের অকাট্য দৃশ্য হিসেবে আমাদের মেনে নিতেই হবে।

পার্থিবতার পৃথক ছবির একটা উদাহরণ হল মহাজাগতিক বস্তুর গতি বর্ণনার জন্যে ১৫০ খ্রিস্টাব্দে আনা টলেমি-র (৮৫ এ.ডি.-১৬৫ এ.ডি.) মডেল। টলেমি তার আবিষ্কারটি প্রকাশ করেছিলেন ১৩ খণ্ডের এক বইতে সাধারণত যা আরবী নাম “আলমাজেস্ট” হিসেবেই পরিচিত। পৃথিবীর যে গোলকের মতো আকার, সে যে নিশ্চল হয়ে ব্রহ্মাণ্ডের মাঝখানে বসে আছে আর মহাকাশের সঙ্গে দূরত্বের তুলনায় তার আয়তন হিসেবে-না-আনার মতোই ছোট --- আলমাজেস্ট শুরু হচ্ছে এর কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে। আবার কোপার্নিকাস ১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দে এমন এক পৃথিবীর বর্ণনা দিলেন যেখানে সূর্য স্থির আর গ্রহগুলো বৃত্তাকার পথে পাক খাচ্ছে তার চারদিকে।

এখন, কোনটা বাস্তব, টলেমি না কোপার্নিকাসের নকশা? যদিও মানুষজনের পক্ষে এটা বলা অস্বাভাবিক নয় যে কোপার্নিকাস টলেমিকে ভুল প্রতিপন্ন করলেন, কিন্তু তা সত্যি হবে না। যেমন আমাদের স্বাভাবিক দেখা বনাম সোনালিমাছের দেখা --- যে-কেউ এর কোনও একটা ছবি ব্যবহার করতে পারে ব্রহ্মাণ্ডের মডেল হিসেবে, কেননা জগত-ব্যাপারে আমাদের পর্যবেক্ষণকে পৃথিবী বা সূর্য, যে-কোনও একটিকে কেন্দ্রে রেখেই ব্যাখ্যা করা যায়। মহাবিশ্বের প্রকৃতি নিয়ে দার্শনিক বিতর্কে এর যা-ই ভূমিকা হোক না কেন, কোপার্নিকাসের ছাঁচের আসল সুবিধে স্রেফ এটুকু যে গতিবেগের সূত্রগুলোর সমীকরণ সেই নকশাতে অনেক সরল যেখানে সূর্য স্থির অবস্থায় আছে।

এক ভিন্ন ধরণের বিকল্প বাস্তবতা দেখা গিয়েছে সায়েন্স ফিকশান সিনেমা “দ্য ম্যাট্রিক্স”-এ। এই ফিলমে মানুষ নিজের অজান্তে বুদ্ধিমান কম্পিউটারের তৈরি এক সিমুলেটেড অপ্রকৃত (virtual) বাস্তবতার মধ্যে বাস করছে যেখানে তারা শান্ত আর সন্তুষ্ট থাকে আর সেই ফাঁকে কম্পিউটার মানুষের জৈব-বৈদ্যুতিক শক্তি (জিনিসটা যাই হোক না কেন!) শুষে নেয়। এই ভাবনা হয়তো খুব বেশি কষ্টকল্পিত নয়, কেননা অনেক মানুষই ওয়েবসাইটগুলোর অনুকারক (simulated) বাস্তবতার মধ্যে সময় কাটাতে পছন্দ করে, যেন এটা তাদের দ্বিতীয় জীবন। কিন্তু আমরা কীভাবে বুঝলাম যে, মানুষ কম্পিউটারের তৈরি টিভি সিরিয়ালের কিছু চরিত্র নয় শুধু? যদি একটা বানানো কাল্পনিক জগতে বাস করতাম, তবে ঘটনার কোনও যুক্তিগ্রাহ্যতা বা ধারাবাহিকতা থাকত না, ঘটনারা মেনে চলত না কোনও নিয়মও। ওই ভিনগ্রহের প্রাণী, (ফিলমে) আমরা যাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছি, আমাদের প্রতিক্রিয়া তাদের আরও বেশি ইন্টারেস্টিং বা মজার লাগত। ধরুন, গোটা চাঁদ ভেঙ্গে অর্ধেক হয়ে গেল অথবা পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষের ব্যানানা ক্রিম পাই-এর ওপর সামলানো যাচ্ছে না এমন ভয়ানক লোভ তৈরি হয়েছে। কিন্তু যদি অন্য গ্রহের প্রাণীরা নতুন কোনও নিয়ম প্রণয়ন করে ফ্যালে, আমরা কোনওভাবেই তাদের জানাতে পারব না যে এই ছদ্মবেশী বাস্তবের বাইরেও একটা বাস্তবতা ছিল। বরং, তখন অ্যালিয়েনরা যে-পৃথিবীতে বাস করে সেটাকেই “সত্যি” বলা ঠিক হবে আর সিন্থেটিক পৃথিবীকে “মিথ্যে”। কিন্তু আমাদের মতোই অনুকারক জগতের সত্তারাও যদি বাইরে থেকে তাদের ব্রহ্মাণ্ডকে দেখতে না পায়, তবে তাদের নিজেদের রিয়ালিটির ছবিকে সন্দেহ করার কোনও কারণই থাকবে না। এটা হল সেই চিন্তার আধুনিক চেহারা যা বলে, আমরা প্রত্যেকেই অন্য কারও স্বপ্নের আবিষ্কার! 

আগের উদাহরণগুলো থেকে এই বইয়ের পক্ষে দরকারি একটা সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসেঃ বাস্তবতার কোনও দৃশ্য বা তত্ত্ব-নিরপেক্ষ ধারণা হয় না। বরং এবার আমরা সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করব, যার নাম মডেল(নকশা)-নির্ভর বাস্তবতা। ধারণাটা এই রকমঃ একটা ভৌত তত্ত্ব বা জগত-ছবি হল একটা নকশা (সাধারণত অঙ্কের ধাঁচের) আর এক গুচ্ছ নিয়ম দিয়ে তৈরি, যে নিয়ম নকশার উপাদানগুলোকে পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করে।
এর ফলে একটা কাঠামো পাওয়া গেল যার সাহায্য নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানকে ব্যাখ্যা করা যাবে।

প্লেটো ও তার পরের দার্শনিকেরা বছরের পর বছর বাস্তবতার স্বরূপ নিয়ে তর্ক করে গেছেন। ধ্রুপদী বিজ্ঞান এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে, একটা সত্যিকারের বাস্তব বহির্জগত রয়েছে যার চরিত্রধর্ম নির্দিষ্ট এবং তাকে যারা অনুভব করছে তাদের উপস্থিতি-নিরপেক্ষ সেটা। ধ্রুপদী বিজ্ঞান অনুযায়ী কিছু বস্তু অস্তিত্ববান; তাদের ভৌত বৈশিষ্ট্য আছে, যেমন গতি বা ভর --- যে গতি বা ভরের স্পষ্টভাবে নির্ধারিত মানও রয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করলে আমাদের তত্ত্বগুলো সেই বস্তু ও তাদের ধর্ম বর্ণনা করার চেষ্টা করে, এবং আমাদের পরিমাপ আর প্রত্যক্ষ উপলব্ধি সেই বর্ণনার সঙ্গে মিলেও যায়। এখানে যাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে আর যে পর্যবেক্ষণ করছে, দুটোই জগতের অংশ যে জগতের বস্তুগত অস্তিত্ব আছে, এবং এদের মধ্যে পার্থক্যের কোনও অর্থপূর্ণ তাতপর্য নেই। অন্য ভাষায় বলা যায়, আপনি যদি দেখেন একদল জেব্রা কোথাও কার পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়ার জন্যে নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে, তার কারণ বাস্তবিকই তারা একদল জেব্রা যারা কোথাও কার পার্কিংয়ের জায়গা পাওয়ার জন্যে নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে। যারা যারা ঘটনাটা দেখছেন, প্রত্যেকেই এই একই বৈশিষ্ট্যের পরিচয় পাবেন। এবং জেব্রাদল একই চরিত্রবৈশিষ্ট্য ধারণ করে থাকবে তাদের কেউ দেখুক চাই না দেখুক। দর্শনে এই বিশ্বাসের নামই বাস্তববাদ (realism)।

রিয়ালিজম একটা লোভনীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চয়ই, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান এর পক্ষে দাঁড়ানোটা মুশকিল করে তুলেছে। উদাহরণ দিইঃ কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার নীতি অনুযায়ী (যা কিনা প্রকৃতির একেবারে নিখুঁত বর্ণনা দেয়) একটা কণার না আছে নির্দিষ্ট অবস্থান, না নির্দিষ্ট গতিবেগ যতক্ষণ না পর্যন্ত ওই পরিমানগুলোকে কোনও পর্যবেক্ষক মেপে নিচ্ছে। কাজেই --- কোনও পরিমাপ কোনও নির্দিষ্ট ফলাফল দেয় এইজন্য যে, যাকে মাপা হল সেই সময় তার ওই মাপই ছিল --- একথাটা বলা ঠিক হবে না। সত্যি বলতে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে একক বস্তুর নির্দিষ্ট অস্তিত্ব পর্যন্ত নেই, বরং তারা অনেকগুলো পদার্থের সমাহার হিসেবে অবস্থান করে। আর, হোলোগ্রাফিক নীতি নামক তত্ত্বটা যদি সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে আমরা আর আমাদের চারমাত্রিক পৃথিবী পাঁচমাত্রার স্পেস-টাইমের সীমানায় একটা ছায়ার মতো আছি। সেক্ষেত্রে ব্রহ্মাণ্ডে আমাদের অবস্থা গোল্ডফিশের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কঠিনরকম বাস্তববাদীরা প্রায়ই তর্ক করেন যে তারাই সফল, কেননা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু ব্যাপারটা হল, আলাদা আলাদা তত্ত্ব একই ঘটনাকে সার্থক ভাবে বর্ণনা করতে পারে একেবারে অসদৃশ ধারণাগত কাঠামোর সাহায্যে। আসলে, অনেক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে --- যেগুলো সফল বলে প্রমাণিত --- পরে অন্য তত্ত্বেরা এসে সরিয়ে দিয়েছে, যারা বাস্তবতার নতুন ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং একইভাবে সফল।

ঐতিহ্যগতভাবে যারা বাস্তববাদকে স্বীকার করেন না, সেই বিরোধীকুল মনে করছেন, তাত্ত্বিক জ্ঞান আর পর্যবেক্ষণ-জনিত জ্ঞানের মধ্যে একটা তফাত আছে। তারা ঠিক তাদের স্বভাব-মতোই যুক্তি দেখিয়ে বলেন যে, পর্যবেক্ষণ আর পরীক্ষা অর্থপূর্ণ ব্যাপার নিশ্চয়ই, কিন্তু তত্ত্ব একটা সুবিধেজনক অস্ত্র ছাড়া কিছু নয় যেটা এমনকি যাকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে সেই বাহ্যমূর্তি(phenomena)-কে বিশেষভাবে চিনিয়ে দেবে এমন কোনও গভীরতর সত্যকেও ধরতে পারে না। বাস্তবতা-তত্ত্বের বিরোধী কিছু মানুষ তো বিজ্ঞানকে শুধু সেইসব বস্তুতেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান যাদের দেখতে পাওয়া যায়। ঠিক এই কারণে উনবিংশ শতকের অনেকে অণুর ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কেননা, আমরা কোনওদিন একটা অণুও চোখে দেখব না। জর্জ বার্কলে (১৬৮৫-১৭৫৩) এতদূর পর্যন্ত গিয়েছিলেন যে বলে বসেন, মন আর তার চিন্তা ছাড়া আর সব কিছু অস্তিত্বহীন। ইংরেজ সাহিত্যিক ও অভিধান-রচয়িতা ডক্টর স্যামুয়েল জনসন (১৭০৯-১৭৮৪)-এর কাছে তার এক বন্ধু যখন মন্তব্য করেন যে বার্কলে-র দাবী খুব সম্ভবত খণ্ডন করা যায় না, শোনা যায় জনসন বড় একটা পাথরের চাঁইয়ের কাছে হেঁটে গিয়ে সেটায় এক লাথি বসিয়ে বলেন, “আমি এইভাবে খণ্ডন করলাম”। অবশ্য জনসন পায়ে যে ব্যথাটা পেলেন, সেটাও তার মনেরই একটা আইডিয়া, কাজেই তিনি যে বার্কলের মতটাকে যে খুব হারাতে পেরেছিলেন, তা হয়তো নয়। তবু জনসনের এই কাজ দার্শনিক ডেভিড হিউম(১৭১১-১৭৭৬)-এর দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে। হিউম লিখেছিলেন, যদিও আমাদের বস্তুগত বাস্তবতায় বিশ্বাস করার কোনও যুক্তিযুক্ত কারণ নেই, তেমনি এটা সত্যিই আছে ভেবে নিয়ে কাজ করা ছাড়া অন্য বিকল্পও নেই।

বাস্তববাদী আর বাস্তবতা-বিরোধী এই দুই দলের সব তর্ক আর আলোচনার বারোটা বাজিয়ে দেয় নকশা-নির্ভর বাস্তবতা। এই বাস্তবতা অনুযায়ী, কোনও নকশা সত্যি কিনা প্রশ্ন করার মানে হয় না, শুধু এটুকু দেখা দরকার যে সেটা পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলছে কী? আবার, যদি এমন দুটো মডেল থাকে যে দুটোই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সহমত হচ্ছে, যেমন গোল্ডফিশ আর আমাদের দেখা বাস্তবতা, তাহলে কেউ বলতে পারবে না একটা অন্যটার চেয়ে ভালো। যে পরিস্থিতিকে বিচার করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর ক’রে কোনও মানুষ যে নকশাটা বেশি সুবিধেজনক, সেটাই ব্যবহার করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যে গোল পাত্রের মধ্যে আছে, তার কাছে সোনালিমাছের দেখা ছবিটাই ঠিক-ঠাক হবে, আবার যে বাইরে আছে, তার কাছে পৃথিবীতে একটা পাত্রের ভেতরে বসে থেকে মহাকাশে কোনও দূরের ছায়াপথের বর্ণনা করা হয়ে পড়বে খুব বিদঘুটে একটা কাজ। কেননা, পৃথিবীর সূর্যের চারদিকে ঘোরা বা নিজের অক্ষে ওর পাক খাওয়ার জন্যে পাত্রটাও তো ঘুরতে থাকবে।
বিজ্ঞানের মতো প্রত্যেক দিনের জীবনেও আমরা মডেল তৈরি করি। নকশা-নির্ভর বাস্তবতা শুধু বৈজ্ঞানিক আদরা-র বেলাতেই প্রয়োগ করা হবে এমন নয়, প্রাত্যহিক পৃথিবীকে ব্যাখ্যা আর বোঝার জন্যে আমরা সবাই যে-সমস্ত সচেতন এবং অবচেতন মানসিক মডেল তৈরি করছি, তার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়। আমাদের দেখা-শোনার পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষক মানে “আমাদের” বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, কেননা এই দেখা-শোনা তৈরি হয়েছে আমাদেরই পঞ্চেন্দ্রিয়-গ্রাহ্য অনুভব ও যেভাবে আমরা চিন্তা আর যুক্তিবিচার করি, তার ভেতর দিয়ে। মানুষের ইন্দ্রিয়-নির্ভর দেখা-শোনা আর সেখান থেকে পাওয়া পর্যবেক্ষণ, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে তার তাত্ত্বিক জগত, সেটা খুব প্রত্যক্ষভাবে তৈরি হয়নি। বরং, এই চেহারাটা একধরণের লেন্সের ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে, যে লেন্স আসলে মানুষের মস্তিষ্কের ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা।
আমরা যেভাবে একটা বস্তু দেখি-শুনি, তার সঙ্গে নকশা-নির্ভর বাস্তবতা মিলে যায়। দৃষ্টিশক্তির বেলায়, অপটিক নার্ভ বরাবর মানুষ যে সার-সার সংকেত পায়, সেগুলো সেই ধরণের ইমেজ তৈরি করতে পারে না যা আমরা টেলিভিশনে দেখে অভ্যস্ত। যেখানে অপটিক নার্ভ রেটিনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, সেখানে একটা অন্ধকার অংশ (blind spot) আছে, আর আমাদের চোখের দৃষ্টিক্ষেত্রে ভালো রেজোলিউশান (resolution) আছে, এমন জায়গাটা হল রেটিনার ঠিক মধ্যিখানে একেবারে সংকীর্ণ, এক ডিগ্রি মতো কৌণিক দৃষ্টি (visual angle ) --- একহাত দূরত্বে নিজের হাতের বুড়ো আঙুলটা ধরলে তার চওড়াই-টা যেমন হবে। কাজেই কাঁচা তথ্য (data, ভারি বাংলা “উপাত্ত”), যা মস্তিষ্কে পাঠানো হয়, হল খারাপ পিক্সিল-এর ছবি, যার মধ্যিখানে আবার একটা ছেঁদা! আমাদের কপাল ভালো যে মানুষের মস্তিষ্ক সেই তথ্য প্রসেস করতে পারে, দুচোখ থেকেই তথ্যের ইনপুট নিয়ে তাদের মেলায় আর এই আন্দাজ করে শূন্যস্থানগুলো ভরাট করে যে আশ-পাশের জায়গাগুলোর চাক্ষুষ বৈশিষ্ট্যও (visual property)একই রকম এবং প্রক্ষেপক (interpolating) চরিত্রের। এছাড়াও সে রেটিনা থেকে দ্বিমাত্রিক তথ্যগুলো নিয়ে তা থেকে একটা ত্রিমাত্রিক জায়গার ধারণা তৈরি করে। অন্যভাবে বলা যায়, ব্রেন এখানে একটা মানসিক ছবি বা মডেল তৈরি করছে।

আমাদের মস্তিষ্ক নকশা বানাতে এত দক্ষ যে, কোনও মানুষকে যদি এমন চশমা পরিয়ে দেওয়া যায় যাতে সে সব ছবি উলটো দেখবে, কিছুক্ষণ পরে মস্তিষ্ক মডেলটা বদলে নেবে যাতে আবার সে সব ঠিক-ঠাক দেখে। এবার চশমাটা সরিয়ে নিলে মানুষটা আবার অল্প সময়ের জন্যে সব উলটো দেখবে বটে, তারপর আবার ছবিটা সোজা করে নেবে। এ-থেকে বোঝা যায়, যখন কেউ বলে, “আমি চেয়ারটা দেখছি”, তার মানে শুধু এই যে সে চেয়ার থেকে বিচ্ছুরিত আলো ব্যবহার ক’রে চেয়ারের একটা মানসিক ইমেজ বা নকশা বানিয়েছে। যদি এই মডেলটা উলটো তৈরি হয়, কপাল ভালো থাকলে সে চেয়ারে বসার আগে তার ব্রেন ছবিটা সংশোধন করে নেবে!

আরেকটা সমস্যা যেটা নকশা-নির্ভর বস্তবতা সমাধান করে, বা অন্তত এড়াতে পারে, সেটা হল অস্তিত্বের অর্থ। কীভাবে আমি জানব যে টেবিলটা রয়েছে যদি আমি ঘরের বাইরে গিয়ে সেটাকে দেখতে না পাই? কিছু জিনিস আমরা দেখতে পাই না, যেমন ইলেকট্রন বা কোয়ার্ক, এর মানে কী? যে কণিকাগুলো প্রোটন বা নিউট্রন গঠন করে তারা অস্তিত্ববান নয়? কেউ এমন একটা মডেল তৈরি করতে পারে যে আমরা ঘর থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই টেবিলটা অদৃশ্য হয়ে গেল, আবার ফিরে এল যেই আমরা ঘরে ঢুকেছি। কিন্তু ব্যাপারটা একটু বিদঘুটে হয়ে যাবে। তাছাড়া তখন কী হবে, যদি আমি বাইরে থাকার সময় কিছু ঘটে, ধরা যাক... ছাদটা ভেঙ্গে পড়ল? আমি তো আমি-ঘরে-না-থাকলে-টেবিলটা-উবে-যায় মডেল-এর লোক, কীভাবে এই ব্যাপারটা হিসেবে ধরব যে, পরের বার যেই ঘরে ঢুকলাম, টেবিলটার পুনরাবির্ভাব হল ভাঙা অবস্থায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে থেকে? তার চেয়ে যে মডেলে টেবিল থেকে যায়, সেটা অনেক সরল আর পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলেও যাবে। এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারি আমরা!

কিশমিশের কাহিনি (গল্প)

কিশমিশের কাহিনি

বেড়াল দেখলেই আমার মাথা গরম হয়ে যায় – মা’র মুখে এই কথাটা যে কতবার শুনেছে পুক্কা। আর অবাক হয়ে ভেবেছে, তার নিজের কেন ঠিক উল্টোটাই হয়ে থাকে! প্রথমেই মনে হয়, আহ, চান না করেই ওরা কেমন সাদা সাদা ডালিয়া ফুল, ঝকঝকে। তারপর বুড়ো-অশ্বত্থগাছ বেড়ালগুলোও কত আদুরে, পিঠে হাত ছোঁয়াতে না ছোঁয়াতেই গলায় গার্গল করার মতো শব্দ। মুখের দিকে ঠায় তাকিয়ে এমন বসে থাকবে, এতবার মিউ মিউ ডাকবে যে সন্দেহই থাকে না তোমার দেওয়া মাছের কাঁটাটা, পাঁউরুটির টুকরোটা, এমনকি সকালের মুড়ির বাটি থেকে মেঝেয় ছড়ানো মুড়িগুলো তাড়া করে খেতে পারছে বলেই ও বেঁচে আছে। আশ্রিতকে ত্যাগ করা ঘোর অন্যায় --- এটা বাবার উক্তি।

আর কিশমিশই তো তাদের একমাত্র আশ্রিত। কিন্তু বেচারা বাবার শাস্ত্রবচন কোনও কাজে এল না! ফাঁকা রেলস্টেশনে হাতে একটা বাজারের থলে ধরে দাঁড়িয়ে ভাবছিল পুক্কা। আর এর জন্যে দায়ি বাবাই...না না, বাবার অসুখ। শীতের দুটো মাস বাড়ির পরিস্থিতি একদম পালটে যায়। বাজারে চৌমাথায় তাদের বইয়ের দোকানটা বন্ধ আর বাড়িতে ভোরবেলা থেকে বাবার নিঃশ্বাসও আটকে আসছে কাশির তাড়সে। মা একবার গরম জল এনে দেবে তো একবার তুলসি আর বাসকপাতা মেড়ে সেই রস মধুতে মিশিয়ে মুখের সামনে ধরবে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। শেষ পর্যন্ত বিষ্ণু ডাক্তারের বড়ি...খাওয়ানো-মাত্র বাবা অবশ, ঘুমোচ্ছে, মাথা তোলার শক্তিটুকুও নেই। গতবছর পাড়ার দোকান মেডিসিনো-র অঞ্জনকাকু বলল, বউদি, একবার কষ্ট করে শ্রীবাস্তবকে দেখিয়ে নিন, বুকের ডাক্তার, এম ডি। ব্যাস, শ্রীবাস্তবকে দেখানো অবদি মা কিশমিশের ওপর আরও চটা। তুই আপদ বিদেয় করবি এক্ষুনি, শুক্কুরবার কালীপুজোটা যাক। ওগুলোর জন্যেই এ-বাড়িতে আর অসুখবিসুখ ফুরোতে পায় না। সাধে কি আর বেড়াল দেখলে আমার মাথা...।

ট্রেন থেমেছে বামনগাছিতে, তাদের দত্তপুকুরের আগের স্টেশান। কিশমিশকে ব্যাগ থেকে বার করল পুক্কা। তার পর ট্রেনটা ছেড়েছে যেই, আস্তে করে নামিয়ে দিল প্ল্যাটফর্মে। কিশমিশ ভেবেছে পুক্কাও নামবে, ছুটছে ট্রেনের পাশে-পাশে। তারপর বেড়ালের ইন্দ্রিয় যখন টের পেল, ব্যাপারটা সুবিধের নয়, একটা প্রাণপণ ঝপাং। কিন্তু রানিং করা তো শেখেনি, উঠেই গড়িয়ে গেল, মাথা ঠুকল লোহার দেয়ালে। তৎক্ষণাৎ ওকে কোলে তুলে নিয়েছে পুক্কা। কিশমিশ চার হাতপায়ে ওর ডান কব্জিটা আঁকড়ে ধরে যেন বলছে, আমাকে আমার নামিয়ে দেবে না তো!

পরের স্টেশানে নেমে উলটো দিকের ট্রেন ধরে ফেরত এল সে। কিন্তু বাড়ির দিকে না এগিয়ে চলল স্কুল ছাড়িয়ে চড়কপাড়ার ওপাশটায়। মা কাল রাতে অনেকক্ষণ বুঝিয়েছে, বাস্তব ডাক্তার (মা বোধহয় ডাক্তারবাবুর টাইটেলকে নাম ভেবেছিল) বলে দিয়েছেন, ঘরে কোনও লোমওলা জীব ঢোকানো চলবে না। ও তো মেয়ে-বেড়াল, আর একটু বড় হলেই ছ’মাস অন্তর সংসার বাড়তে থাকবে। তার চেয়ে এখনই পার কর।

জোড়াবটতলা পৌঁছে দেখা গেল, মোড়ের মাথায় চায়ের দোকানগুলো জমজমাট, কিন্তু আগের কাঁচা রাস্তাটার অনেকখানিতে আলো নেই, ভুতুড়ে মতো। সেই ঘুপচি অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে ঢুকে থলে থেকে যেই নামিয়েছে কিশমিশকে, ওমনি গায়ে কোত্থেকে টর্চের আলো --- “অ্যাই, ওটা কী হচ্ছে?” মোটা মতো লোকটা, গায়ে ভুরভুর করছে কঠিন বডি লোশানের গন্ধ, পুক্কার ঘাড়েই এসে পড়ে প্রায়। “এ-পাড়ায় অলরেডি ছেচল্লিশটা আছে। আমি নয়ন মুখার্জি, ক্ল্যাসিকাল সিঙ্গার, আমার কাছে পাকা খবর, এই পোষ মাসেই আমরা হাফ সেঞ্চুরি ক্রশ করে যাচ্ছি। কিন্তু বে-আইনি ভাবে তো জনসংখ্যা বাড়াতে দেব না, ওস্তাদ! পাসপোর্ট নেই, ভিসা নেই, মানে পিয়োর অনুপ্রবেশ। যাও, তুলে নিয়ে চলে যাও।“

বাবাও একদিন গল্প করছিল, ওদের ছোটবেলায় বাড়িতে ছিল চার চারটে মেনি। তাদের বাচ্চাগুলো দুধ ছাড়া মাত্র বাবার ঠাম্মা এই রকম থলেতে পুরেই সন্ধের মুখে অন্য পাড়ায় ছেড়ে দিয়ে আসত। আবার অন্য পাড়া থেকেও তাদের গুড়গুড়িরা একই ফরমুলায় চালান আসত এখানে। অর্থাৎ এক গ্রামের বেড়াল অন্য গ্রামে মানুষ হচ্ছে। তবে আর লাভ কী হল? লাভ হল, বাবা একটু মজার হাসি হাসবে --- শক্তির নিত্যতা সূত্রের!

কিন্তু ছেলেরও নাকি পরে বাবার এই অসুখটা ধরার সম্ভাবনা থেকে যায়, ডক্টর শ্রীবাস্তব বলেছেন। মার খুব ভয় বেড়েছে তাতে। পুক্কার অবাক লাগে। ছোট্ট, সুন্দর পুঁচকিটা, যার বাঁ কান মিশমিশ কালো আর প্রায় সারা গা কালচে বাদামি বলেই নামকরণের সার্থকতা, যে কাল সন্ধেরাতের ঘুম পর্যন্ত তার কোলের মধ্যেই দিল, সেই হবে ওর শ্বাসকষ্টের কারণ!

আর একটা হিসেবেও পুক্কার ভুল হয়েছিল। শুরুতেই ওর যাওয়া উচিত ছিল চাষিপাড়ার দিকটায়, ধরো, ইসুবাটি কি কালিয়ানই। ওদিককার লোকজন সন্ধে একটু ডাগর হলেই খাওয়া-দাওয়া সারে, খুব ভোরে উঠে মাঠ নিড়োতে যেতে হবে না? অনেকটা হেঁটে যশোর রোড, তেঁতুলতলার ব্রিজ পার হয়ে পুক্কা এসে ঢুকল ইসুবাটির মুখে। তারপর, একটা ঘনমতো বাঁশবাগান দেখে থলে উপুড়।

ফিরে আসার রাস্তায় নিজের পাদুটো আর টানতে পারছে না পুক্কাকে। কিশমিশ কী করছে এখন অচেনা নিঃঝুম গাছপালার অন্ধকারে? মিউ মিউ ডাকতে ডাকতে বেরিয়ে এসেছে রাস্তায়, গা ঘেঁষে ধমক দেওয়ার শব্দে দৌড়ে যাচ্ছে বাইক কিম্বা অটো? হয়তো আশ-পাশের কুকুরের দল সারারাত ওকে তাড়া করে মেরে ফেলতে চাইবে আর কাল সকালে স্কুলের বাচ্চাদের হাতের টিপ প্র্যাকটিস! কেন সে কিশমিশকে বাড়িতেই রাখল না? না হয় ঘরে ঢুকতে দিত না, ছুঁতোই না, শুধু খাবার বেড়ে দেওয়া কলতলার চাতালে। অন্তত বেঁচে তো থাকত চোখের সামনে আর তারা নিজেরাও থেকে যেত সুস্থ। কত বড় জহ্লাদের মতো সে তাকে এক চরম বিপদে ফেলে দিয়ে চলে এসেছে।

মৈত্রী সংঘ পার হয়ে আর একটা মোটে বাঁক, তার পরই নিজের পাড়ায় ঢুকে যাবে। হঠাৎ...আরে, সামনে ওটা কী...কে ওটা...কিশমিশ না! সেই পেছনের ডান পায়ে প্লাস্টারই তো, গোটা চকলেট চেহারায় একটামাত্র পা সাদা বলে যেমন মনে হয়ে থাকে। পুক্কা ছুট্টে গিয়ে কোলে তুলে নিয়েছে---কীভাবে ঠিক চিনে এলি তুই এতদূর থেকে, আমি তো খেয়ালই...চল চল, মাকে সব বুঝিয়ে বলব। কিন্তু কিশমিশ একটু যেন ছটফট করছে কোলের মধ্যে, ওহ নামবি, হিসু করবি, তাই? পুক্কা ওকে নামিয়ে দিচ্ছে মাটিতে। আর তক্ষুনি সেই বেড়াল লাফ দিয়ে উঠে গেল --- পাশে চণ্ডীবাবুস্যারের বাগানঘেরা বাড়ি --- তার পাঁচিলে। তখন অর্ধেক চাঁদ মাথার ওপর ঝুলন্ত, জ্যোৎস্নায় চারপাশ দুধের মতো মসৃণ। আর পাঁচিল থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে ভীষণ এক অচেনা চোখে তাকিয়ে আছে কিশমিশ! থতমত খেয়ে যেই অল্প একটু হাত বাড়াবে সে, মুহূর্তের মধ্যে লাফ দিল ওই অতোটা উঁচু থেকে, বাগানের মধ্যে। কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না পুক্কা। অপেক্ষা করল, তারপর ডাক দিল, কোথায় গেলি, ফিরে আয় লক্ষ্মীটি, তোকে আর ফেলে আসব না, সত্যি বলছি। ডাকতে ডাকতে তার গলা বসে যাচ্ছে, বাতাসে সদ্য নামা হিমের নিচে কেমন ভিজে যাচ্ছে কথাগুলো।

চাঁদের আলো ঠিকরনো বাগানের কলাপাতা শুধু মাথা নাড়ছিল --- না, না, না...।


(আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত)